‘ইরানি প্রযুক্তি’ দিয়েই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র

  • পশ্চিমা প্রযুক্তি দিয়েই ওয়াশিংটন-তেল-আবিবের বিরুদ্ধে লড়ছে তেহরান
  • ব্যবহার করা হয় সস্তা ড্রোন, নকল ক্ষেপণাস্ত্র
  • হামলার জন্য শনিবারকেই বেছে নেওয়া হয়
আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৬:৫৫

যুদ্ধের আগুনে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য। গত শনিবার থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে আমেরিকা এবং ইসরায়েল। এই হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। দুই দেশের হামলার জবাব দিতে পালটা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে চালানো হামলায় ‘ইরানি প্রযুক্তি’কে কাজে লাগিয়েছে। সামরিক অভিযানে দুই দেশ সস্তা মানের ড্রোন এবং নকল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। এছাড়া খামেনিকে হত্যা করতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র শনিবারকেই বেছে নেয়।

যেসব অস্ত্র ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

যুক্তরাষ্ট্র একটি কম মূল্যের ড্রোন ব্যবহার করে। এই ড্রোনটি ইরানের শাহেদ-১৩৬ ইউনিট থেকে উদ্ভূত প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করেছেন মার্কিন বিশেষজ্ঞরা। ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোনের নকশা দেখে লুকাস নামের এক প্রকার ড্রোন তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র। এই ড্রোন তৈরিতে খরচ কম। একটি লুকাস ড্রোন ৩৫ হাজার ডলারে ক্রয় করা যায়। আর টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়। তবে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের সাফল্যের হার বেশি। তবে খরচটা বেশি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিব্রত করতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল কিছু নকল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর ফলে ইরানের সামরিক বাহিনী বেসামাল হয়ে পড়ে। এসব নকল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার পরপরই যুদ্ধবিমান দিয়ে ইরানের আকাশসীমায় ঢুকে পড়ে যৌথ বাহিনী।

অভিযানে এফ-৩৫ স্টেলথ ফাইটার, এফ-২২ স্টেলথ ফাইটার, বি ২ স্টেলথ বম্বারসহ সাত রকমের যুদ্ধবিমানের মাধ্যমে ইরানে হামলা চালায় আমেরিকা। এছাড়াও এ-১০ অ্যাটাক জেটের মাধ্যমে ইরানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভবনে হামলা হয়। শত্রুপক্ষের দিকে নজর রাখতে একাধিক শক্তিশালী যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে আমেরিকা। এর মধ্যে অন্যতম এমকিউ ৯ রিপার ড্রোন। আল কায়দা প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরিকে হত্যায় এই ড্রোন ব্যবহার করেছিল মার্কিন বাহিনী। পণ্যবাহী একাধিক সামরিক বিমানও ইরানে হামলার ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হয়।

শনিবার যে কারণে টার্গেট

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, খামেনিকে হত্যা করতে শনিবারকেই বেছে নেয় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। কারণ গত চার দশক ধরে খামেনিকে হত্যার চেষ্টা হলেও সম্ভব হয়নি। কারণ খামেনি তার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ঘনঘন অবস্থান বদল করেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ ও মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ খামেনির অবস্থান শনাক্ত করার জোর প্রচেষ্টা চালায়। তেহরানের প্রায় সব কটি ট্রাফিক ক্যামেরার ওপর নজরদারি চালায় তেল আবিব। তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিটে খামেনির দপ্তরের নিকটবর্তী একটি বিশেষ ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঐ ক্যামেরায় নজর রেখেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার দেহরক্ষীদের গতিবিধি, তাদের গাড়ি রাখার জায়গা থেকে খামেনির গতিবিধির খোঁজ পায় মোসাদ। শুধু ট্র্যাফিক ক্যামেরাই নয়, খামেনির সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য পেতে হ্যাক করা হতো তেহরানের সিনিয়র কর্মকর্তাদের ফোনও। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, খামেনির ঘনিষ্ঠজনদের কেউ মোসাদকে সহায়তা করেছিলেন।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, ইসরায়েল কয়েক বছর আগে ক্যামেরাগুলোতে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল। পাস্তুর স্ট্রিটের ক্যামেরাটা খামেনির অফিসের দিকে তাক করা। এই ক্যামেরার তথ্যই ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ইসরায়েলের কাছে। সূত্র জানায়, সকাল ৯টায় খামেনির সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা ছিল। ইরানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, মূলত শনিবার বৈঠক করার মূল কারণ ছিল জীবনটাকে বাঁচানো। কারণ খামেনি জানতেন, শনিবার ইহুদিদের সাপ্তাহিক পবিত্র দিন। এই দিনটি ‘সাব্বাত’ নামে পরিচিত।  এটি শুক্রবার সূর্যাস্তের আগে শুরু হয়ে শনিবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে। এই সময়ে ইহুদিরা কাজ বন্ধ রাখেন, সিনাগগে উপাসনা করেন এবং পরিবার ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সময় কাটান। অর্থোডক্স ইহুদিরা এই দিনে কাজ, গাড়ি চালানো বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করেন না। খামেনির ধারণা ছিল, ইসরায়েল এদিন কোনো হামলা চালাবে না। কিন্তু তার শেষ রক্ষা হয়নি।

মার্কিন প্রযুক্তি দিয়েই লড়াই ইরানের!

ইউরোশিয়ান টাইমস জানিয়েছে, ইরান পশ্চিমাদের তৈরি অস্ত্র দিয়েই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দান থেকে রাশিয়া যেসব পশ্চিমা অস্ত্র যেমন জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল বা স্টিঙ্গার এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম জব্দ করেছে, সেগুলো তারা সরাসরি তেহরানে পাঠিয়েছে। ইরানের প্রযুক্তিবিদ ও প্রকৌশলীরা পশ্চিমা প্রযুক্তিগুলোর নকল করে নিজেদের অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করেছে। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহূত পশ্চিমা অস্ত্রগুলো ইরানকে দিয়েছে। এছাড়া চীনও সহায়তা করেছে। অনেক সময় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান সরাসরি যন্ত্রাংশ না পেলেও চীন তাদের বিভিন্ন পশ্চিমা ডিজাইনের ইঞ্জিনের নকশা ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে। এর ফলে ইরানের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে এমন সব আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহূত হচ্ছে যা আসলে জার্মান বা মার্কিন নকশা থেকে কপি করা।

ইত্তেফাক/এনএন