কৃষি উর্বর পার্বত্য জেলা রাঙামাটির অর্থকরী ফল কলা। বারমাসি এ ফল চাষে অল্প খরচ, কম পরিশ্রম হওয়ায় কৃষকরা দিনদিন অন্যান্য ফলনের সঙ্গে কলা চাষে ঝুঁকছেন। তাই বর্তমানে এ ফলটির বাণিজ্য ছাড়িয়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকায়।
জেলার পাহাড়ী এলাকায় প্রায় প্রতিটি পরিবার কলা চাষে যুক্ত আছেন সেই দীর্ঘকাল ধরে। কেউ একক বাগান করছেন, কেউ অন্যান্য ফসলের সঙ্গে কলার চাষ করছেন।
নানিয়ারচর উপজেলার কৃষক নান্টু চাকমা বলেন, আমি তিন একর জায়গায় অন্যান্য ফসলের সঙ্গে কলার চাষ করেছি। আশা করছি কলা চাষ থেকে আমার কয়েক লাখ টাকা আয় আসবে। সারাবছর কলার ফলন পাওয়া গেলেও আগস্ট থেকে অক্টোবর মাসে ফলন মেলে সবচেয়ে বেশি।
কৃষকরা তাদের উৎপাদিত কলা কাপ্তাই হ্রদ মাড়িয়ে জেলা শহরের ভাসমান হাট সমতা ঘাট, ট্রাক টার্মিনাল ঘাটে নিয়ে আসে। সেখান থেকে স্থানীয় পাইকারদের হাত ধরে এসব পাহাড়ি কলা ট্রাক ও পিকআপে বোঝাই করে ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরে নিয়ে যান পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম থেকে আসা কলা ব্যবসায়ী সবুজ চৌধুরী বলেন, আমি কয়েক বছর ধরে কলা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। এখানকার কলায় কোন কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না। সুস্বাদু এবং চাহিদা থাকায় সারা বছর এখান থেকে কলা নিজ জেলায় নিয়ে বিক্রি করি।
কৃষি বিভাগ বলছে, পাহাড়ে কয়েক ধরনের কলা চাষ হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুই জাতের কলা দেখা যায়। একটি ‘বাংলা কলা’। স্থানীয় ভাষায় এর নাম ‘কাট্টলি কলা’। অন্যটি ‘চাঁপা কলা’, স্থানীয় নাম ‘চম্পা কলা’। উঁচু পাহাড়ের মাটিতে জন্মায় বলে এগুলোকে পাহাড়ি কলাও বলা হয়।
রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নানিয়ারচর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি কলা চাষ হয়। এর মধ্যে বাংলা কলা, চাঁপা কলা, সাগর কলা, সূর্যমুখী ও আনাজি জাতের কলা বেশি চাষ হচ্ছে। তবে ‘বাংলা কলা’র চাহিদা বেশি।
জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় ২ হাজার ৩২৫ হেক্টরে মোট ৫১ হাজার ৪৯৯ মেট্রিকটন কলা উৎপাদন হয় বছরে। এরপরে রাঙামাটি সদরে ৯৫৫ হেক্টরে ২১ হাজার ৭৭৪ মেট্রিকটন, বরকল উপজেলায় ২ হাজার ১৫ হেক্টরে ৪৫ হাজার ৩৩৮ মেট্রিকটন, কাউখালীতে ১৫ হাজার ৫৫ হেক্টরে ৩৫ হাজার ২৯৯ মেট্রিকটন, জুরাছড়িতে ১১শ হেক্টরে ২৭ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন, লংগদুতে ১১ হাজার ২৫ হেক্টরে ২৮ হাজার ১২৫ মেট্রিকটন, বাঘাইছড়িতে ১২শ ১৫ হেক্টরে ২৭ হাজার ৯৪৫ মেট্রিকটন, কাপ্তাই উপজেলায় ৭৮৫ হেক্টরে ১৭ হাজার ৬৬৩ মেট্রিকটন, রাজস্থলীতে ৬শ ৬০ হেক্টরে ১৪ হাজার ৭৮৪ মেট্রিকটন এবং বিলাইছড়িতে ১৭৫ হেক্টরে ৪ হাজার ২৫ মেট্রিকটন কলা উৎপাদন হয়েছে।
রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় মোট ১১ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে বছরে প্রায় ৩০ মেট্রিক টন কলা উৎপাদিত হয়। পুরো জেলায় প্রতিবছর ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩শত মেট্রিক টন কলা উৎপাদন হয়। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে কলা চাষের বিশাল সম্ভাবনা আছে। যদি পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক চাষ ও সরকারি সহযোগিতা পাওয়া যায় তাহলে উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। এতে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানিও করা যাবে।
