বাঘায় তৈজসপত্রের অভাবে জৌলুস হারাচ্ছে জাদুঘর

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬, ১৫:০২

মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে জাতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে রাজশাহীর বাঘায় ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি আঞ্চলিক জাদুঘর। জাদুঘরটি আজকের প্রজন্মকে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না।

এখানে জাদুঘর উদ্বোধন করার সময় যে পরিমাণ তৈজসপত্র সংরক্ষণ করা হয়, আজ অবদি সেগুলোই রয়ে গেছে। পুরোনো স্থাপনা থেকে কিছু নিদর্শন এখানে আনার কথা থাকলেও সেটা হয়নি। ফলে মানুষের উপস্থিতি দিন দিন কমে যাওয়ায় জৌলুস হারাচ্ছে বাঘা জাদুঘর।

স্থানীয়রা বলছেন, বাঘা হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক পটভূমি। আজ থেকে ৬শ বছর পূর্বে এখানে পোড়ামাটির ব্যবহার হয়েছে। শুধু তাই নয়, এখানে রয়েছে সুলতানি আমলের কারুকাজ খচিত ঐতিহ্যবাহী বাঘা শাহী মসজিদ, বিশাল আকৃতির দিঘী এবং হযরত শাহদৌলার মাজারসহ একাধিক ওলি আওলিয়াদের মাজার ও কারুকাজ খচিত নারীদের জন্য পৃথক মসজিদ।

বাংলাদেশ প্রাথমিক এবং গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ এর সাবেক মহা-পরিচালক রতন চন্দ্র পন্ডিত বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচিত৷ বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস, জাতিসত্তা বিকাশের সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমা উদঘাটনে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলো অনন্য ভূমিকা পালন করছে। যার বাস্তব কিছু নিদর্শন রয়েছে বাঘায়। সরকার চাইলে এই এলাকাটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলতে পারে।

সুলতানি আমলে বাঘায় একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। তখন এখানে প্রায় দেড় বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে নগর সভ্যতা গড়ে উঠে। এর নিদর্শন এখনো রয়েছে। বাঘা মাজার থেকে এই সীমানার মধ্যে যেকোনো এলাকায় দুই থেকে পাঁচ ফিট মাটি খনন করলেই বেরিয়ে আসে প্রাচীন আমলের ইট এবং পোড়ামাটির বিভিন্ন তৈজসপত্র। এসব ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষা ও প্রদর্শনের জন্য বাঘায় তৈরি করা হয় একটি আঞ্চলিক জাদুঘর। এছাড়াও এখানে রয়েছে হযরত শাহদৌলার মাজার, সুবিশাল দিঘীসহ অসংখ্য প্রাচীন ঐতিহ্য। যা দেখার জন্য এখানে গড়ে উঠেছে পিকনিক কর্নার। 

জাদুঘরের সহকারী কাস্টডিয়ান দবির হোসেন বলেন, এখানে ডিজিটাল যন্ত্রে প্রিন্ট করা ২৩টি মসজিদের ছবি, প্রাচীন আমলের কুরআন শরীফ, কিছু মাটির পাত্র, কারুকাজ খচিত পুরাতন ইট, টাইলস, ব্রোঞ্জের তৈরী পাত্র, পোড়ামাটির বল ও একটি পাথরের উপরে লেখা আরবি হরফ ছাড়া তেমন কিছু নেই। যে কারণে মানুষের উপস্থিতি দিন দিন কমে আসছে। 

দবির হোসেন আরও বলেন, এখানে শৈল্পিক কারুকাজ খচিত কোন উপকরণ নেই। বর্তমানে মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন সংরক্ষণ হিসাবে দেশে যে ১৫টি জাদুঘর রয়েছে সেখানে লোহা, তামা ব্রোঞ্জ ইত্যাদি উপকরণ দ্বারা তৈরি জিনিসপত্র এবং প্রাচীন রাজা-বাদশাদের ঢাল-তলোয়ার, আধুনিক বিদ্যুৎ বাতির পরিবর্তে হারিকেন, হ্যাজাক, পিতলের তৈরী কুপ, লোহার সিন্দুক এবং বেতসহ কাঠের তৈরি অনেকরকম সামগ্রী থাকতে পারতো। যা দেখে উজ্জীবিত হতো আজকের প্রজন্ম। তিনি এই জাদুঘরে নতুন নতুন উপকরণ তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেছেন বলেও উল্লেখ করেন।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাবেহ মহাপরিচালক শফিকুল ইসলাম মুকুট বলেন, আমার প্রচেষ্টা ছিল এখানে মুসলিম স্থাপনা দিয়ে একটি জাদুঘর করবো। সেটি সার্থক হয়েছে। জাদুঘর এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে গবেষকরা আসেন। 

শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস, জাতিসত্তা বিকাশের সুদীর্ঘ পথ পরিক্রমা উদঘাটনে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো অনন্য ভূমিকা পালন করছে৷ এগুলো রক্ষা ও সংরক্ষণ করার দায়িত্ব সকলের। আমি এই জাদুঘরটি উদ্বোধনের সময় স্থানীয় লোকজনের কাছে দাবি রেখেছিলাম, মুসলিম নিদর্শন যদি কারো কাছে থাকে তবে তা জাদুঘরে জমা দেয়ার জন্য। প্রয়োজনে সেই নিদর্শনের নিচে দাতার নাম উল্লেখ থাকবে। তবে এটি খুব বেশি ফলপ্রসূ হয়নি। আমি অচিরেই প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে কথা বলে উপকরণ বাড়ানোর চেষ্টা করবো।

ইত্তেফাক/টিএইচ