এবারের বইমেলা আয়োজনে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতির মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল পরিবেশ সুরক্ষায়। আয়োজকরা ঘোষণা দিয়েছিল, এবারের বইমেলা হবে ‘জিরো ওয়েস্ট বইমেলা’। বলা হয়েছিল মেলা প্রাঙ্গণকে পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত রাখা হবে। স্টল, দোকান, মঞ্চ, ব্যানার, লিফলেট ও খাবারের দোকানগুলোতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ যেমন-পাট, কাপড় ও কাগজ ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। কার্যত তার উল্টোটাই ঘটেছে।
গতকাল বুধবার বিকেল ৪টা ১০ মিনিটেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে দেখা গেল ভিন্ন দৃশ্য। বেশ কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বার্জার পেইন্টের স্টলের সামনে পেতে রাখা চেয়ারের পেছনের অংশে ছড়িয়ে থাকা পলিথিন, কাগজ, ঝরাপাতার স্তুপ ঝাড়ু দিয়ে সরাচ্ছেন। দুরন্ত আর উড়ন্ত ধুলোর দাপটে আগত দর্শনার্থীদের দেখা গেল মুখে মাস্ক আর রুমাল চেপে প্রবেশ করতে! আরো ভেতরে যেতেই দেখা গেল ইটের টুকরো, কাগজের ঠোঙ্গা, ইফতারির প্যাকেট এদিকে সেদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মেলায় যত্রতত্র সিগারেট সেবন করতেও দেখা গেল কাউকে কাউকে। কেবল দেখা গেল না পরিবেশবান্ধব পাট, কাপড় কিংবা কাগজের ব্যবহার! মেলার ১৪তম দিনে এসেও এমন নানা অসঙ্গতিতে ভরা বাংলা একাডেমির জিরো ওয়েস্ট বইমেলার প্রতিশ্রুতিকে পাসমার্কও দেয়া গেল না।
বইমেলার এমন হাল কেন, ক্ষতির পরিমানইবা কেমন জানতে চাইলে অনন্যা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী জ্যেষ্ঠ প্রকাশক মনিরুল হক ইত্তেফাককে বললেন, বইমেলায় এমন অসঙ্গতি অনেক। যা বলে শেষ করা যাবে না। এই মেলা দেখে আমার মনে হচ্ছে— বাংলা একাডেমি প্রশাসনিকভাবে একেবারে ব্যর্থ। এতো সুন্দর মেলাটাকে আরো গুছিয়ে তারা করতে পারতো। সময় ছিল। কিন্তু সবাইকে তারা এক কাতারে আনতে পারেনি শুরু থেকেই। দ্বন্দ্বটা তারাই তৈরী করেছে। শেষ পর্যন্ত তো পেছাতেই হলো।
তিনি বলেন, ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি থাকবে। ক্ষতি তো অবশ্যই হয়েছে। তা বলতে চাই না। আমরা জানতাম বড়ধরণের ক্ষতির মুখে পড়ব। তারপরও নতুন সরকারের আমন্ত্রণে আমরা মেলায় অংশগ্রহণ করেছি। কারণ আমরা চাইনি বইমেলা নিয়ে নতুন সরকার বিব্রত হোক। তাই মেনে নিয়েছি। তবে আমাদের অনেকগুলো দাবি সংস্কৃতি মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী দুজনকে দেয়া হয়েছে। এসব নিয়ে মেলার পরে কথা বলবো। নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে আশা করছি।
কথা হলো ময়ূরপঙ্খী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মিতিয়া ওসমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঈদ মার্কেটিং না করে অনেকে যে এখনো বইমেলায় আসছেন, এটা তো অনেক বড় ব্যাপার। তাদেরকে ধন্যবাদ জানানো উচিত আমাদের।’
কথা হলো দুই মেয়ে ইসবাহ মীমা এবং ইলিনা দীমাকে নিয়ে মেলায় ঘুরতে আসা কমিউনিটি ব্যাংকের কর্মকর্তা ইকরাম হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি সেই সময়ের প্রজন্ম, যে ছোটোবেলায় গ্রামের স্কুলে পড়ালেখা করতাম। যেখানে বই তো দূরের কথা পত্রিকা আসতেই দুইদিন লেগে যেতো। এরপর যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হলাম; টিফিনের পয়সা জমিয়ে নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে ৫ টাকা ১০ টাকা দিয়ে পুরানো বই কিনে পড়া ছিল একমাত্র উপায়। সামর্থ্য হওয়ার পর বাংলা একাডেমিতে এসেই অমর একুশে বইমেলা উপলক্ষে বই কেনা হয়, পড়া হয় আরো বেশি করে। এ কারণে রমজান মাস সত্ত্বেও বাচ্চাদের নিয়ে বইমেলায় এলাম বই কিনতে। ওদেরও নিজেদের পছন্দ মতো বই কিনে দিলাম, নিজের জন্যও কিনলাম। এসব বই সারা বছর পড়ব; এটাই আমাদের স্ট্রাটেজি। আমরা দুই মেয়েও এখন আমার মতো বই পড়তে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।’
মূল মঞ্চ
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় “স্মরণ : এম শমসের আলী” শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম।আলোচনায় অংশ নেন ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী। সভাপতিত্ব করেন আরশাদ মোমেন। বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ড. শমশের আলী ছিলেন বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও শিক্ষাজগতে একজন নক্ষত্র। তিনি গবেষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন তাঁর গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও সৃষ্টিশীল চিন্তাশক্তির মাধ্যমে। তাঁর আগ্রহের বৃহত্ ক্ষেত্রজুড়ে ছিল সাধারণ মানুষের মাঝে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তোলা। একজন শিক্ষক, প্রশাসক ও বিজ্ঞানসংগ্রামী হিসেবে তিনি যেভাবে নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন, তাতে বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষার ভিত মজবুত হয়েছে।
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী বলেন, ড. শমশের আলীর মধ্যে নেতৃত্বদানের সাংগঠনিক গুণাবলি ছিল। বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য বিজ্ঞান ক্লাব আন্দোলন, বিজ্ঞানমেলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উত্সাহ জুগিয়েছেন এবং নানাভাবে সাহায্য করেছেন। তিনি সবসময় সচেষ্ট থেকেছেন তরুণদের বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্য।
আরশাদ মোমেন বলেন, বিজ্ঞান গবেষক শমশের আলী ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত মহানুভব। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চায় অনুপ্রেরণা ও উত্সাহ দানের পাশাপাশি তিনি জ্ঞানার্জনকে আনন্দময় করে তুলতেন। বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে তাঁর নাম অমর হয়ে থাকবে।
আলোচনা পরবর্তী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেন কামাল মিনা, এ বি এম সোহেল রশিদ ও শায়লা আহমেদ। সংগীত পরিবেশন করেন সাইদুর রহমান বয়াতি, অধ্যাপক মাহবুবা বেগম, জি এম জাকির হোসেন, মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, মোঃ শাহীনুর ইসলাম, বাউল সুভাষ বিশ্বাস, মিন্টু বাউল, নিশাত আনজুম সাকি এবং এস এম শামীম আক্তার। লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন কবি হাসান হাফিজ, কবি শাহীন রেজা এবং কবি মাসুদুল হক।
নতুন বই
বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গতকাল বুধবার অমর একুশে বইমেলার ১৪তম দিনে মেলায় নতুন বই এসেছে ১১৩টি। আর গত ১৪ দিনে মোট নতুন বই প্রকাশ হয়েছে ১ হাজার ২৫৫টি। এর মধ্যে কথাপ্রকাশ এনেছে রামেন্দু মজুমদারের ভ্রান্তিবিলাস ও হালাকুর প্রত্যাবর্তন, আগামী প্রকাশনী এনেছে মোহন রায়হানের ‘ফিরিয়ে দাও সেই স্টেনগান’, প্রথমা প্রকাশন এনেছে মাসউদ আহমাদের ‘লাবণ্যর মুখ’, জ্যোতিপ্রকাশ এনেছে আবু আলীর ‘সহজ ভাষায় বীমা পাঠ’, শালুক এনেছে চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদের ‘লোরকার দেশে’, প্রতিবিম্ব প্রকাশন এনেছে মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের ‘গুলবাগিচায় জুঁই’, ময়ূরপঙ্খী এনেছে মেহেদী হাসানের ‘প্রাণীদের মজার ভ্রমণ’, কথাপ্রকাশ এনেছে দিলওয়ার হোসেন অনুদিত ‘জাপানের রূপকথা’ ও আখতার হুসেনের সম্পাদনায় ‘ইরানের রূপকথা’, জুঁই প্রকাশন এনেছে জুলফিয়া ইসলামের দুটি বই ‘আদর্শ মানুষের গল্প’ ও ‘গল্পের রংধণু’ উল্লেখযোগ্য।

