আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নারীদের বিরুদ্ধে একের পর এক আইন কার্যকর হয়েছে। দেশটির নারীদের ঘরবন্দি ও বিশেষ করে নারীদের ওপর পুরুষদের নির্যাতনের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের নতুন আইনে নারীদের ওপর শারীরিক সহিংসতার মাত্রা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, চলতি সপ্তাহে তার এক শিউরে ওঠা চিত্র সামনে এসেছে।
স্বামীর হাতে কেবল (তার) দিয়ে মারধরের শিকার হয়ে উত্তর আফগানিস্তানের এক নারী আদালত শরণাপন্ন হন। এতে বিচারক উল্টো তাকে উপহাস করে বলেছেন, তুমি শুধু এই কারণেই বিচ্ছেদ চাও? সামান্য রাগ আর কয়েকটা মার খেলে তো আর মরে যাবে না।
ভুক্তভোগী নারী ফারজানা (ছদ্মনাম) জানান, তার স্বামী বদমেজাজি এবং সামান্য কারণেই তাকে মারধর করেন। ফারজানার ডান পা বাঁ পায়ের তুলনায় কিছুটা ছোট হওয়ায় স্বামী তাকে নিয়মিত ‘প্রতিবন্ধী’ বলে অপমান ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন।
সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ফারজানা দীর্ঘদিন এই নির্যাতন সহ্য করে আসছিলেন। তবে সম্প্রতি সহিংসতার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়।
ফারজানা বলেন, একদিন আমি অনেক অসুস্থ ছিলাম এবং সেদিন রাতের খাবার রান্না করার মতো কোনো শক্তি ছিল না। স্বামী কাজ থেকে ফিরলে আমাকে বলে, এখন তুমি ঘরের কাজটুকুও করো না। আমি তাকে অসুস্থতার কথা জানালে সে মোবাইল চার্জারের কেবল দিয়ে আমাকে বেদম পেটায়। আমার পিঠে ও হাতে সেই মারের চিহ্ন কয়েক দিন পর্যন্ত ছিল। কিন্তু তখন আমি সেই ছবি তুলে রাখার কথা ভাবিনি।
এমন নির্যাতনের পর ফারজানা সিদ্ধান্ত নেন তিনি আদালতে বিচ্ছেদের আবেদন করবেন। কিন্তু তার মামলা তালেবানের আদালত পর্যন্ত পৌঁছালে আদালত তার আবেদন শুধু বাতিলই করেনি উল্টো ফারজানাকে নিয়ে উপহাস করেছে।
ফারজানা বলেন, যখন আমি বলি স্বামী আমাকে মারধর করে, নিয়মিত উপহাস, অপমান করে এবং তাই আমি বিচ্ছেদ চাই- তখন বিচারক পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘তুমি শুধু এই কারণেই ডিভোর্স চাও? আর অন্য কোনো কারণ নেই?
ফারজানা যখন তাঁর ওপর হওয়া সাম্প্রতিককালের নির্যাতনের বর্ণনা দেন, তখন বিচারক প্রমাণ দেখতে চান। কিন্তু ফারজানা কোনো প্রমাণ দেখাতে না পারায় বিচারক তাকে ভর্ৎসনা করে বলেন, তুমি যখন তরুণী ছিলে তখন স্বামীর সঙ্গে দিনগুলো উপভোগ করেছ। এখন সে বৃদ্ধ হচ্ছে দেখে তুমি বিচ্ছেদের অজুহাত খুঁজছ যাতে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারো। ফিরে যাও, তোমার স্বামী অনেক ভালো, তার সঙ্গেই থাকো। ইসলামে স্বামীকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে যেন অবাধ্য স্ত্রীকে শাসনের জন্য মারধর করা হয়। যাও, আর কখনো এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিচ্ছেদ চাইতে আসবে না।
আফগানিস্তান-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা রওয়াদারির প্রধান শাহরজাদ আকবর বলেন, বর্তমানে আফগানিস্তানে এমন ঘটনা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীদের পারিবারিক সহিংসতার মধ্যেই বেঁচে থাকতে হয়, নতুবা তালেবান আদালতের কাছে বিচার চাইতে হয়—যেখানে আবার তাদের উল্টো উপদেশ দেওয়া হয় এবং পুনরায় সেই সহিংস বাড়িতেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
অনেক ক্ষেত্রে স্বামীর ‘অবাধ্য’ হওয়ার অপরাধে নারীদেরকেই শাস্তি দেওয়া হয়।
বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এবং আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন যে আফগান নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের নিষেধাজ্ঞা আসলে ‘লিঙ্গবৈষম্য’ বা ‘জেন্ডার অ্যাপার্থাইড’।
গত বছর তালেবানের নতুন দণ্ডবিধিতে নারীদের ওপর সহিংসতাকে আরও উসকে দেওয়া হয়েছে। দেশটিতে নতুন এই বিধি অনুযায়ী, পুরুষেরা তাদের স্ত্রীদের মারধর করতে পারবেন যতক্ষণ না হাড় ভাঙা বা গভীর জখম হয়।

‘হাড় না ভাঙা’ পর্যন্ত স্ত্রীকে মারতে পারবে স্বামী, আফগানিস্তানে নতুন আইন