ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি কঠিন কৌশলগত পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর তিনি দ্রুত বিজয়ের কথা বললেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা জটিলতার কারণে এই যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে স্পষ্ট বিজয়ের পথ সহজ নয়।
যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাতের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—পরিস্থিতির ওপর ওয়াশিংটনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে এই প্রণালী বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দ্রুত অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়ছে, যা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে।
সামরিকভাবে এই পথ খুলে দেওয়াও সহজ নয়। কারণ ইরানের জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং সামুদ্রিক হুমকির কারণে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দুর্বল যুদ্ধ পরিকল্পনা
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সংঘাত শুরু করার সময় ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে যথেষ্ট পরিকল্পনা করা হয়নি। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা জানতেন, ইরান আক্রমণের জবাবে হরমুজ প্রণালীকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন লরেন্স ব্রেনান বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এই জলপথ খোলা রাখা অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পুনরায় চালু করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।
সামরিক ঝুঁকি
যুদ্ধের প্রভাব শুধু তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। ইরাকের আকাশে একটি মার্কিন ট্যাঙ্কার বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাও এই সংঘাতের ঝুঁকি সামনে এনেছে। এই বিমানটি যুদ্ধবিমানগুলোকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে ইতিমধ্যে সাতজন মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া
যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও আলোড়ন তৈরি করছে। ভার্জিনিয়া ও মিশিগানে সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে, যেগুলো তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যদিও এসব ঘটনার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত নয়, তবুও উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে বিভ্রান্তি
ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যেও স্পষ্টতা নেই। কখনও বলা হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা হয়েছে, আবার কখনও যুদ্ধকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
এই অস্পষ্টতা যুদ্ধের একটি পরিষ্কার ‘বিজয়ের বয়ান’ তৈরি করা কঠিন করে তুলছে।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রভাব
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন। পরে তার ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন।
এই পরিবর্তন অনেকের কাছে যুদ্ধকে সরাসরি সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরে। তবে নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত সাফল্যের গল্প কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইসরাইল ফ্যাক্টর
যুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি জটিলতা হলো ইসরাইলের অবস্থান। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নেতৃত্বাধীন সরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে।
ফলে ওয়াশিংটন যুদ্ধ থামাতে চাইলে তেলআবিব সেই পথে হাঁটবে কি না—তা নিশ্চিত নয়।
পারমাণবিক প্রশ্ন
ট্রাম্প দাবি করেছেন, বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে যদি দেশটি তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধরে রাখতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে আবারও সেই কর্মসূচি শুরু করার সম্ভাবনা থেকে যায়।
ইরানে জনবিদ্রোহ হয়নি
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত বড় কোনো গণঅভ্যুত্থানের লক্ষণ দেখা যায়নি।
এতে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যও এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দ্রুত বিজয় ঘোষণার সুযোগ সীমিত। সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক শক্তির ভূমিকা ফলাফলকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য শুধু সামরিক নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
