ইরানের তেলের প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ সামরিক হামলার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, খারগ দ্বীপের ‘প্রতিটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ সফলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।
যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন যে মানবিক কারণে দ্বীপের মূল তেল অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত করা হয়নি, তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই দাবির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি অর্থনীতিবিদ এড হার্স আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, খারগ একটি অত্যন্ত ছোট দ্বীপ এবং সেখানে ৯৫ শতাংশ তেল রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানলেও তেলের রপ্তানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়া প্রায় অসম্ভব। তার মতে, এর ফলে ইরানের তেল রপ্তানি ব্যবস্থা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
খারগ দ্বীপে এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ‘আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর’ এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে যে, ইরানের তেল বা জ্বালানি অবকাঠামোতে কোনো প্রকার আঘাত হানা হলে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতাকারী সকল তেল কোম্পানির স্থাপনা ‘মুহূর্তের মধ্যে ছাইয়ের স্তূপে’ পরিণত করা হবে।
ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এই বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আঞ্চলিক কোনো দেশ বা বিদেশি কোম্পানি যদি যুক্তরাষ্ট্রকে কোনোভাবে সহায়তা করে, তবে তাদের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোও ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ইরানের এই সরাসরি হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
জ্বালানি বিশ্লেষক এড হার্স আরও সতর্ক করেছেন যে, যদি এই যুদ্ধের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং ইরাক ও কুয়েতের মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও স্থবির হয়ে থাকে, তবে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে এশীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে, যারা মূলত অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পণ্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে সাফ জানিয়েছেন যে, ইরান বা অন্য কেউ যদি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে, তবে তিনি খারগের তেল অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন। অর্থাৎ, সামনের দিনগুলোতে তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা সম্পূর্ণভাবে হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি এই খারগ দ্বীপের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়, তাই এই অঞ্চলের সামান্য অস্থিতিশীলতাও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত সামরিক আস্ফালন এবং অন্যদিকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের পাল্টা হুমকি বিশ্ব সম্প্রদায়কে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের এই উত্তাপ যদি কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী স্থায়ী হয়, তবে বিশ্ববাজার তেলের ইতিহাসের বৃহত্তম ঘাটতির সম্মুখীন হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান

