বাবাকে হারিয়ে রাস্তায় চা বিক্রি, অসুস্থ মা ও ছোট বোনকে নিয়ে শিশু ইমরানের সংগ্রামী জীবন

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৬, ২১:৩১

যে বয়সে একটি শিশুর কাঁধে থাকার কথা বই খাতা আর স্কুল ব্যাগ, সেই বয়সেই নয় বছরের ছোট্ট ইমরানের সঙ্গী চায়ের ফ্লাক্স। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানে দোকানে ঘুরে চা বিক্রি করেই চলছে তার জীবন সংগ্রাম। সড়ক দুর্ঘটনায় বাবাকে হারানোর পর অসুস্থ মা আর ছোট বোনের অন্নসংস্থানের দায়িত্ব এখন ছোট্ট ইমরানের কাঁধে।

ইমরানের বয়স মাত্র ৯ বছর। দুই বছর আগে যখন তার বয়স ছিল সাত, তখনই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তার বাবা। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে পরিবারটি।

জীবিকার সন্ধানে খুলনা থেকে স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সাভারে আসেন ইমরানের বাবা। সেখানে একটি ভাড়া বাসায় থেকে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। আয় কম হলেও কষ্টের মধ্যেই মোটামুটি চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু হঠাৎ একটি সড়ক দুর্ঘটনায় সবকিছু যেন এক মুহূর্তে থমকে যায়। 

বাবার মৃত্যুর পর ইমরানের মা মানুষের বাসায় বাসায় কাজ করে কোনোমতে সংসার চালানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু গত দুই তিন মাস ধরে তিনি অসুস্থ হয়ে এখন প্রায় শয্যাশায়ী। ফলে সংসারের খরচ জোগাতে বাধ্য হয়ে এই অল্প বয়সেই কাজে নেমে পড়েছে ইমরান।

ইমরান জানায়, তার ছোট বোন আমেনার বয়স সাত বছর। সে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। মা অসুস্থ থাকায় সংসারের সব খরচ এখন তারই জোগাড় করতে হয়। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চা বিক্রি করে যে টাকা পায় তা দিয়েই চলে তাদের তিনজনের জীবন।

বর্তমানে মা ও ছোট বোনকে নিয়ে সাভারের ফুলবাড়িয়া বাজার এলাকার জয়নাল নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে ভাড়া থাকে ইমরান। ছোট একটি কক্ষের জন্য প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হয় তিন হাজার টাকা। এর সঙ্গে খাবার খরচ, ওষুধ ও ছোট বোনের পড়াশোনার খরচও জোগাতে হয় তাকে। 

জীবনের বাস্তবতা যেন খুব দ্রুতই বড় করে দিয়েছে ছোট্ট এই শিশুটিকে। যে বয়সে তার বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সেই জীবনের কঠিন লড়াইয়ে নেমেছে সে। হাতে বই খাতা নয়, বরং লম্বা চায়ের ফ্লাক্স নিয়েই তাকে ছুটে বেড়াতে হয় বাজার থেকে মার্কেট, দোকান থেকে দোকানে। একদিন কাজ না করলে অসুস্থ মা আর ছোট বোনের মুখে খাবার তুলে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। 

স্থানীয় কয়েকজন দোকানি জানান, প্রায় প্রতিদিনই তারা ইমরানকে চা বিক্রি করতে দেখেন। ছোট্ট বয়স হলেও ছেলেটি খুব ভদ্র এবং পরিশ্রমী। অনেক সময় তারা সহানুভূতি থেকে তাকে একটু বেশি টাকা দেন বা খাবার খেতে দেন।

দোকানিরা বলেন, এত অল্প বয়সে একটি শিশুর এভাবে কাজ করা সত্যিই কষ্টের বিষয়। কিন্তু বাস্তবতার কাছে হার মেনে ইমরানকে এই পথেই নামতে হয়েছে। অল্প বয়সে
সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়া ইমরানের এই সংগ্রামী জীবন অনেকের মনেই নাড়া দেয়।

ইত্তেফাক/এমএসআর/এএম