হরমুজ প্রণালীর পর নতুন শঙ্কা এখন বাব এল মান্দেব

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২৬, ০৯:২৮

হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ার পর এবার বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চলাচল পথ ‘বাব এল মান্দেব’ প্রণালি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী মাত্র ২০ মাইল চওড়া এই সরু জলপথটি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের প্রধান গেটওয়ে। 

ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এই প্রণালীর একপাশে অবস্থান করায় তেহরান যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়াতে চায়, তবে তারা হুথিদের ব্যবহার করে লোহিত সাগরের এই বাণিজ্য পথটি যে কোনো সময় বন্ধ করে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান যদি তার এই মিত্র শক্তিকে যুদ্ধে নামায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।

ইতিমধ্যে হুথি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তারা যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিলে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নৌ-অবরোধ ঘোষণা করবে। হুথি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা আবেদ আল-থাওর ইরানের সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিকে জানিয়েছেন, মার্কিন ভূখণ্ড বা দখলকৃত অঞ্চল অভিমুখে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজ ও বিমানবাহী রণতরীগুলো হুথিদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের প্রতিবাদে হুথিরা লোহিত সাগরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল, যার ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ তেল এবং ২০ শতাংশ কন্টেইনারবাহী জাহাজের যাতায়াত ব্যাহত হয়েছিল। বর্তমান যুদ্ধের প্রায় তিন সপ্তাহ পার হতে চলায় এবং তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় নতুন কোনো অবরোধ বিশ্ববাজারে বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতি ঘটাতে পারে।

লোহিত সাগরের এই সম্ভাব্য অস্থিরতা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে ফেলেছে সৌদি আরবকে। রিয়াদ বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর অবরোধ এড়াতে তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু টার্মিনাল দিয়ে তেল রপ্তানি করছে। চলতি মার্চ মাসে সৌদি আরব এই পথে রেকর্ড ৫৯ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে, যা শীঘ্রই ৭০ লাখে পৌঁছানোর কথা।

কিন্তু হুথিরা যদি লোহিত সাগরে পুনরায় হামলা শুরু করে, তবে সৌদি আরবের এই বিকল্প পথটিও ঝুঁকির মুখে পড়বে। লয়েড’স লিস্টের বিশ্লেষক সাইমন মিলার জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতিতে জাহাজগুলোকে সুয়েজ খাল হয়ে ঘুরে যেতে হবে এবং মিশরের সুমেদ পাইপলাইন ব্যবহার করতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে ইরান ও হুথিদের হাতেই বিশ্ব বাণিজ্যের চাবিকাঠি থাকবে বলে তিনি মনে করেন।

তবে হুথিরা কেন এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে সরাসরি যোগ দেয়নি, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যদিও হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের ইসলামি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধের শুরুতেই ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা শুরু করেছে, কিন্তু হুথিরা এখনও সংযম দেখাচ্ছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের গবেষক অ্যালিসন মাইনরের মতে, হুথিরা ইরানের প্রক্সি হিসেবে পরিচিত হলেও তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক লক্ষ্য ও স্বতন্ত্র মতাদর্শ রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতির পর তাদের অস্ত্রের মজুদ কমে যাওয়াও একটি কারণ হতে পারে। এদিকে ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র হুথিদের এই যুদ্ধে না জড়াতে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে এবং তাদের নেতাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তবুও তেহরান যদি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে লোহিত সাগরের এই নতুন ‘চোক পয়েন্ট’ ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সহ্যক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যাবে।

সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

ইত্তেফাক/টিএইচ