নেতানিয়াহুর শাসনামলে ইসরায়েল বর্ণবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে: সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৬, ১১:৪২

ইসরায়েলের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিপি লিভনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের তীব্র সমালোচনা করে অভিযোগ তুলেছেন যে, তার প্রশাসন ইসরায়েল রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিগুলোকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে। 

শুক্রবার (২৭ মার্চ) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিভনি উল্লেখ করেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সবার জন্য সমান আইন এবং অস্ত্রের ওপর একক কর্তৃত্ব থাকা আবশ্যক। কিন্তু বর্তমানে ইসরায়েলের কোনো স্বীকৃত সীমানা নেই এবং সেখানে সবার জন্য অভিন্ন আইন ও বিচারব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় আইনের সমান্তরালে ধর্মীয় আইন কার্যকর করা হচ্ছে। 

তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সেটলার মিলিশিয়া বাহিনী গঠন এবং অনির্দিষ্টকালের দখলদারত্বকে প্রশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে পঙ্গু করে দেওয়ার অভিযোগ আনেন। লিভনির মতে, এই উগ্র মিলিশিয়া বাহিনীগুলো এখন নিজেদের ইচ্ছেমতো তাণ্ডব চালাচ্ছে এবং সরকার কার্যত রাষ্ট্রটিকেই ভেঙে ফেলছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেটলারদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর দমনপীড়নের প্রেক্ষাপটে লিভনির এই মন্তব্য বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে এখন এক ধরনের ঐক্যমত্য তৈরি হয়েছে, ইসরায়েল বর্তমানে ‘বর্ণবৈষম্য’ বা অ্যাপার্থাইডের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করছে। 

ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘বিটিসেলেম’ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, ইসরায়েল তার নিয়ন্ত্রণাধীন পুরো অঞ্চলে একটি বর্ণবাদী শাসন পরিচালনা করছে। একইভাবে ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনিদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়ন ও বর্ণবৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অবৈধ ইসরায়েলি সেটলাররা অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনি গ্রাম ও শহরগুলোতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত ও বেপরোয়া হামলা শুরু করেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আরোপিত চলাচলের বিধিনিষেধ ও চেকপয়েন্টগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সেটলাররা ফিলিস্তিনি জনপদগুলোতে তাণ্ডব জোরদার করেছে। 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও বিভিন্ন মেডিকেল টিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাস্তা বন্ধ থাকার কারণে গুরুতর আহত ফিলিস্তিনিদের কাছে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে, যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে পশ্চিম তীরের ১৩টি ভিন্ন স্থানে সেটলাররা সমন্বিত অভিযান চালিয়ে ঘরবাড়ি ও যানবাহনে আগুন দিয়েছে এবং বাসিন্দাদের ওপর শারীরিক হামলা চালিয়েছে। জেনিন, নাবলুস এবং সালফিতের কাছের গ্রামগুলোতে এই সহিংসতার মাত্রা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের কৃষিজমি, সম্পদ ও জনপদের ওপর ১ হাজার ১০০-এর বেশি হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি সেটলাররা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব হামলার বেশিরভাগই পরিচালিত হয় ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর প্রত্যক্ষ সুরক্ষায়। বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী ও উগ্র সেটলারদের পক্ষ থেকে সব মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার ছোট-বড় হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। 

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিপি লিভনি মনে করেন, রাষ্ট্রীয় মদতে পরিচালিত এই সহিংসতা এবং সমান্তরাল বিচারব্যবস্থা ইসরায়েলকে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র থেকে বিচ্যুত করে উগ্র ধর্মীয় ও বর্ণবাদী অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রকাঠামোর ভাঙন ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

সূত্র: এএফপি

ইত্তেফাক/টিএইচ