গাজার মতো লেবাননে দীর্ঘমেয়াদী বাফার জোন তৈরির পথে ইসরায়েল

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৮:৪৯

লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর ক্রমবর্ধমান শক্তির মুখে ইসরায়েলি বাহিনী আবারও দক্ষিণ লেবাননে একটি স্থায়ী ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ বা বাফার জোন তৈরির পরিকল্পনা করছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, শত্রু ভূখণ্ডের গভীরে তিনটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে এবং লেবাননে বিদ্যমান বাফার জোনটিকে আরও সম্প্রসারিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহর অনুপ্রবেশের হুমকি নস্যাৎ করা এবং ইসরায়েল সীমান্ত থেকে অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল হামলার ঝুঁকি কমিয়ে আনা। তবে ১৮ বছরের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী দখলদারিত্বের পর ২০০০ সালে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া ইসরায়েলের জন্য এই সিদ্ধান্ত আবারও এক ‘লেবানিজ চোরাবালিতে’ আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ঐতিহাসিকভাবে ১৯৮২ সালে ইসরায়েল যখন প্রথম লেবাননে প্রবেশ করেছিল, তখন তাদের লক্ষ্য ছিল পিএলও এবং সিরীয় প্রভাব মুক্ত করে সেখানে একটি বন্ধুপ্রতিম সরকার প্রতিষ্ঠা করা। তবে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি এবং পরবর্তীতে হিজবুল্লাহর উত্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বর্তমানে ইসরায়েল ঠিক একই যুক্তিতে এবং একই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে, যা কয়েক দশক আগের সেই ট্রমাটিক অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। 

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহর হুমকি পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত লিটানি নদী পর্যন্ত এই নিরাপত্তা অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতেই থাকবে। কিন্তু হিজবুল্লাহর বিশাল রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের কারণে এই হুমকি অদূর ভবিষ্যতে শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতির ফলে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা সরাসরি সীমান্ত থেকে দূরে থাকলেও রকেট হামলার ঝুঁকি কমেনি। সামরিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড দখল করে রাখলে সেখানে রসদ সরবরাহের জন্য কনভয় এবং আউটপোস্ট তৈরি করতে হয়, যা হিজবুল্লাহর জন্য সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

নব্বইয়ের দশকেও ইসরায়েলি বাহিনী এ ধরনের চোরাগোপ্তা হামলায় ব্যাপক প্রাণহানির শিকার হয়েছিল। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী দখলদারিত্ব লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিজবুল্লাহর অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, কারণ এটি বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লেবানিজদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ করে দেবে।

ইসরায়েলের সামনে বর্তমানে তিনটি প্রধান বিকল্প রয়েছে: প্রথমত, একটি স্থায়ী বাফার জোন ধরে রাখা যা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ায়; দ্বিতীয়ত, লেবানন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণ করা, যদিও বর্তমান সরকারের সেই সক্ষমতা নেই; এবং তৃতীয়ত, হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি ধ্বংস করার জন্য একটি চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক স্থল অভিযান চালানো। 

বর্তমানে ইসরায়েলি নেতৃত্ব তৃতীয় বিকল্পটির চেয়ে বাফার জোন ধরে রাখাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তবে ইতিহাসের শিক্ষা অনুযায়ী, লেবাননের মাটিতে একবার প্রবেশ করা সহজ হলেও সেখান থেকে সফলভাবে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।

সূত্র: দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল

ইত্তেফাক/টিএইচ