গত শনিবার কেরানীগঞ্জে গ্যাস লাইটার তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ছয় জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হইয়াছে। এই অগ্নিদুর্ঘটনা আবারও আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়া গেল। গরমের মৌসুম এলেই দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা যেন এক অনিবার্য দুর্যোগের রূপ পরিগ্রহ করে। এইবারও উহার ব্যতিক্রম ঘটিল না। মাত্র ঘণ্টা কয়েকের ব্যবধানে অনেকগুলি তাজা প্রাণ ঝরিয়া গেল, বহু মানুষ আহত হইলেন, অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হইল। ফি বৎসর এইভাবে বিশেষত গ্রীষ্ম মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলির পরিপ্রেক্ষিতে কি প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক নহে যে, এই আগুন কি শুধুই দুর্ঘটনা: নাকি ইহা আমাদের দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্বল তদারকি এবং জনসচেতনতার ঘাটতির নির্মম পরিণতি? বাস্তবতা বলিতেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে থাকে শর্ট সার্কিট, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক লাইন, গ্যাস লিকেজ, দাহ্য পদার্থের অনিরাপদ মজুত এবং জরুরি বহির্গমন পথ না থাকা। কেরানীগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনা যেন সেই পুরাতন ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে।
বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ডের ইতিহাস দীর্ঘ এবং বেদনাবহ। নিমতলী, চকবাজার, সেজান জুস কারখানা, বেইলী রোড-প্রতিটি ঘটনা ছিল একেকটি ট্র্যাজেডি এবং উহা আমাদের প্রতি 'সতর্কবার্তা' ছুড়িয়া দিয়াছিল; কিন্তু প্রতিবারই কিছু দিনের আলোচনা, তদন্ত কমিটি ও প্রতিশ্রুতির পর সকল কিছু যেন ফিরিয়া যায় পূর্বের অবস্থায়। জনগণের একাংশের মধ্যেও অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে অসচেতনতা অত্যন্ত প্রকট। এমনও শোনা যায়, অনেকে এখনো বাসাবাড়ি কিংবা কর্মস্থলে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখাকে খুব একটা প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করেন না; এমনকি উহা থাকিলেও উহার ব্যবহার জানেন না। অথচ উন্নত বিশ্বে আমরা কী প্রত্যক্ষ করিয়া থাকি? সেইখানে অগ্নিনিরাপত্তাকে নাগরিক জীবনের মৌলিক অংশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও সিংগাপুরের ন্যায় দেশসমূহে নিয়মিত ফায়ার ড্রিল, বাধ্যতামূলক ইমার্জেন্সি ইভাকুয়েশন মহড়া, প্রতিটি ভবনে স্মোক ডিটেক্টর ও স্প্রিংকলার সিস্টেম এবং ভবন ব্যবহারের পূর্বে কঠোর ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা হয়। অধিকন্তু, স্কুল, অফিস, শপিং মল, কারখানা-সর্বত্র নির্দিষ্ট সময় অন্তর অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া অনুষ্ঠিত হয়, যাহাতে বিপদের মুহূর্তে মানুষ আতঙ্কিত না হইয়া সুশৃঙ্খলভাবে বাহির হইতে পারে। অনেক দেশে বৎসরে অন্তত দুই বার মহড়া আইনত বাধ্যতামূলক।
সুতরাং, অগ্নিনিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশেও এই ধরনের বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। এই জন্য শিল্পকারখানা, আবাসিক ভবন ও বাজার এলাকায় জরুরি নির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র এবং অ্যালার্ম ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করিতে হইবে। গরম মৌসুমের বিষয়টি মাথায় রাখিয়া বিদ্যুৎলাইন ও গ্যাস-সংযোগের বিশেষ নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানোও জরুরি। কারণ, প্রায়ই লিকেজ হইতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কথা শুনা যায়। এই সকল উদ্যোগের পাশাপাশি স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত এবং কারখানায় নিয়মিত মহড়া ও প্রশিক্ষণ চালুর বিষয়ে জোর দিতে হইবে। জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রচারণারও বিশেষ প্রয়োজন। সবচাইতে বড় কথা হইল, আইন প্রয়োগে কঠোরতা অত্যাবশ্যক। অননুমোদিত কারখানা, ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম এবং অগ্নিনিরাপত্তাহীন ভবনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না লইলে এই মৃত্যুমিছিল থামিবে না।
কেরানীগঞ্জের আগুন কেবল ছয়টি প্রাণই কাড়িয়া লয় নাই; বরং ইহা আমাদের আরও একবার সতর্ক করিয়া দিল যে, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সামাজিক উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি দূর করা না গেলে, প্রতি বৎসরের ন্যায় এইবারও আগুনের লেলিহান শিখায় বহু তাজা প্রাণ পুড়িয়া অঙ্গার হইবে-ইহা কেবলই কথার কথা নহে। অতএব, এই বিষয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ অবধারিত হইয়া পড়িয়াছে। তাহা না হইলে এই গ্রীষ্মে আবারও সংবাদপত্রগুলি এই শিরোনামে সয়লাব হইয়া উঠিবে যে, 'আবারও আগুন, আরও মৃত্যু।'
