মৃৎশিল্প হারালেও পোড়ামাটির চাকিতে বেঁচে আছে পাল পরিবার

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:২০

মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নোহাটা গ্রামের পাল সম্প্রদায়ের অন্তত ২৫টি পরিবারের ভাগ্যের চাকা এখন ঘুরছে পোড়ামাটির চাকি তৈরির ওপর ভর করে। এই পরিবারগুলোর প্রধান আয়ের উৎসই হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের এই বিশেষ পণ্য।

একসময় মৃৎশিল্পে তৈরি কলস, হাঁড়ি-পাতিল, মাটির ব্যাংক, ফুলদানি, শোপিস, পুতুল ও খেলনাসহ নানা সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন এ অঞ্চলের পাল সম্প্রদায়ের মানুষ। বিশেষ করে বৈশাখ এলেই দিন-রাত ব্যস্ততা থাকত তাদের। কিন্তু প্লাস্টিক, মেলামাইন ও আধুনিক ক্রোকারিজের দাপটে সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। ফলে অনেক পরিবারই পৈত্রিক পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন।

তবে এখনও উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়নের নোহাটা গ্রামে অন্তত ২৫টি পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। তারা এখন অন্যান্য মাটির পণ্য কম তৈরি করে মূলত পোড়ামাটির চাকি তৈরিতে বেশি সময় দিচ্ছেন। এতে শ্রম ও সময় কম লাগার পাশাপাশি কিছুটা লাভও হচ্ছে।

বর্তমানে বাথরুম ও বর্জ্য পানির হাউজ নির্মাণে পোড়ামাটির চাকির চাহিদা বেড়েছে। স্বল্প খরচ, টেকসই ব্যবহার এবং সহজলভ্যতার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব চাকি পার্শ্ববর্তী জেলা ও উপজেলাতেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে নোহাটা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, উজ্জ্বল পাল, তিনাত পাল, মনিকুমার পাল, লিটন পাল, সুজিত পাল, মিনু পালসহ বিভিন্ন পরিবারের সদস্যরা দিনভর চাকি তৈরিতে ব্যস্ত। কেউ মাটি দিয়ে রিং তৈরি করছেন, কেউ চুল্লিতে পোড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আবার কেউ পোড়ানো চাকি নামাচ্ছেন।

পলাশ পাল বলেন, ‘আগে সহজে মাটি পাওয়া যেত এবং দামও কম ছিল। এখন মাটি সংগ্রহ কঠিন, খরচও বেশি। জ্বালানির দামও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে।’

এনি কুমার পাল জানান, ‘আমাদের অধিকাংশ পরিবারের নিজস্ব জমি নেই। এই পেশার ওপর নির্ভর করেই জীবন চলে। বছরে ৮-৯ মাস কাজ থাকে, বাকি সময় প্রতিমা তৈরির কাজ করি। তবে পরবর্তী প্রজন্ম এই পেশায় থাকবে কিনা, তা অনিশ্চিত।’

নেপাল কুমার পাল বলেন, ‘জ্বালানি কাঠ, মাটি, শ্রমিক মজুরি, পোড়ানো ও পরিবহন—সব মিলিয়ে খরচ অনেক। কিন্তু লাভ খুবই কম। ফলে এ পেশা দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। সরকারিভাবে সহায়তা ও স্বল্পসুদে ঋণ পেলে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব।’

এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক জানান, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি চালু করেছে। ‘ঋণ বা ভাতা পেতে কেউ আবেদন করলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে,’ বলেন তিনি।

ইত্তেফাক/এএইচপি