চাকরি নয়, যেন স্থায়ী আসন

বেবিচকে বছরের পর বছর একই পদে কর্মকর্তারা

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:৩৬

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে একই পদে কর্মরত থাকার একটি অস্বাভাবিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাফরুল হাসান টানা ২২ বছর ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। একাধিকবার বদলির উদ্যোগ নেওয়া হলেও কার্যত তাকে সরানো সম্ভব হয়নি।

শুধু জাফরুল হাসানই নন, আবুল খায়ের ইবনে আলী ও হাবিবা আফরোজও প্রায় ১৭ বছর ধরে একই পদে কর্মরত আছেন। এ ছাড়া অন্তত অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘ সময় ধরে একই পদে বহাল রয়েছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, বেবিচকের ভেতরে প্রভাবশালী কয়েকটি চক্র ঘুরেফিরে একই স্থানে থেকে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত। এসব চক্রের বিরুদ্ধে মানবপাচারসহ নানা অপকর্মের অভিযোগও উঠেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

এদিকে, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে। নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থেকেও কেবল হাজিরা দিয়ে চলে যাওয়ার মতো আচরণও লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সবকটি বিমানবন্দরের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে নানা উদ্যোগ নিলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

বেবিচকসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আকাশপথের নিরাপত্তা ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ধীরে ধীরে একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর ‘আখের গোছানোর’ নিরাপদ চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।

বেবিচকে কর্মরত একাধিক সূত্রে জানা যায়, সংস্থাটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বছরের পর বছর ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট জেঁকে বসে আছে। একই পদে দীর্ঘদিন অবস্থান করে তারা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটিয়েছে।

বেবিচকের নিয়মানুযায়ী তিন বছর পরপর বদলির বিধান থাকলেও অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবে এই সিন্ডিকেট সদস্যরা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

এমনকি কোনো কারণে বদলির আদেশ জারি হলেও প্রভাবশালী মহলের তদবিরে তা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাতিল হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে কার্যত বদলির নিয়ম শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তেমনি একজন উপপরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, একাধিকবার তার বিরুদ্ধে বদলির আদেশ জারি হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। প্রভাবশালী মহলের তদবিরে এসব আদেশ বারবার স্থগিত রাখা হয় বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, বেবিচকের সদর দপ্তর থেকে শুরু করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরে অন্তত অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, যারা ১০ থেকে ২৬ বছরের বেশি সময় ধরে একই ডেস্ক বা একই শাখায় কর্মরত।

সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী, সংবেদনশীল পদে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি দায়িত্বে থাকার সুযোগ নেই। তবে বেবিচকের ক্ষেত্রে এই বিধান কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেবিচকের সদর দপ্তরের একজন উচ্চমান সহকারী গত এক দশক ধরে একই ফাইলে কাজ করছেন। তার মাধ্যমে ঠিকাদারদের বিল পাস হয়। গত পাঁচ বছরে তিনি অন্তত চারটি বদলি আদেশ বাতিল করিয়েছেন। 

এ প্রসঙ্গে বেবিচকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিষয়টি স্বীকার করে জানান, অভ্যন্তরীণ এই সিন্ডিকেট ভাঙা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা অনেক সময় চেষ্টা করেন চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু রাজনৈতিক এবং প্রভাবশালী মহলের এমন চাপ আসে, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ২০১৯ ও ২০২১ সালে দুদক বেবিচকের দুর্নীতি প্রতিরোধে ১১ দফা সুপারিশসংবলিত একটি প্রতিবেদন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। সেখানে ‘একই পদে দীর্ঘদিন অবস্থান’কে দুর্নীতির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

তারা আরও জানান, বেবিচক একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এখানে দুর্নীতির কারণে যদি অযোগ্য লোক বছরের পর বছর একই পদে বসে থাকে, তবে তা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং আকাশপথের নিরাপত্তার জন্যও চরম হুমকি। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কঠোর হস্তক্ষেপ এবং ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন না করলে এই ‘মধু’ খাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া কঠিন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেবিচকের বিভিন্ন বিভাগ এবং বিভিন্ন বিমানবন্দরে সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ১০ থেকে ২৬ বছর একটানা একই দপ্তরে কর্মরত আছেন। তার মধ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুমিনুল ইসলাম ১০ বছর, ফায়ার বিভাগের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম ১২ বছর, শাহ আমানত বিমানবন্দরের এরোড্রাম অফিসার আবু মো. ওমর শরীফ ১৬ বছর, উচ্চমান সহকারী আবদুল করিম ১৬ বছর, প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাফরুল হাসান ২২ বছর, মোশাররফ হোসেন ১৬ বছর, আবুল খায়ের ইবনে আলী ১৯ বছর, হাবিবা আফরোজ ১৯ বছর, সামসুন্নাহার লিজা ১৯ বছর, উচ্চমান সহকারী লিটন চন্দ্র সরকার ১০ বছর, প্রশাসন বিভাগের সিনিয়র অফিসার সুব্রত চন্দ্র দে ১৮ বছর, সিনিয়র অফিসার সেলিম মিয়া ১৮ বছর, ওয়াহিদা ওলিউর ইসলাম ২৬ বছর, পার্সোনেল অফিসার কাজী ফৌজিয়া নাহার ২৬ বছর, উচ্চমান সহকারী জিয়াউর রহমান ১৬ বছর, খালেদা ফেরদৌস ১৬ বছর, উচ্চমান করণিক রুহুল কুদ্দুস ১৬ বছর, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল বাশার ১৬ বছর, উচ্চমান সহকারী পি-এ টু সদস্য (প্রশাসন) এসএম সায়েজুল হক ১৬ বছর, সহকারী সমন্বয় কর্মকর্তা রুহুল আমীন ১৬ বছর, প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহীন হোসেন ১৬ বছর, হিসাবরক্ষক ফারজানা আক্তার ১৬ বছর, সুশান্তকুমার বিশ্বাস হিসাবরক্ষক ১৯ বছর ধরে একই দপ্তরে রয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার-বাণিজ্য হচ্ছে বেবিচকে। পাস জালিয়াতি, অবৈধ লোকবল নিয়োগ এবং নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্রয়ে কারসাজি হচ্ছে। বিমানবন্দরের জমি লিজ দেওয়া এবং দোকান বরাদ্দ নিয়ে বিশাল অংকের লেনদেন হচ্ছে। প্রয়োজনীয় মালামাল না কিনেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করছে বিশাল ওই সিন্ডিকেটটি। অভিযোগ আছে বেবিচকের অনেক নিম্নপদস্থ কর্মচারীও কোটি টাকার মালিক। রাজধানীতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি এবং বিদেশে অর্থপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। অথচ তাদের দৃশ্যমান আয়ের উৎস কেবল সরকারি বেতন।

বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাবলুর রহমান জানিয়েছেন, সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী একই পদে কতদিন থাকতে পারবে তার নিয়ম আছে। বেশি দিন ধরে যারা আছেন, তাদের তালিকা করা হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এএইচপি