সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে জন-আকাঙ্ক্ষাকে অপমান করা হচ্ছে: জামায়াত

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৫৯

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা বিভিন্ন সংস্কারমূলক অধ্যাদেশ বাদ দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বলেছে, এর মাধ্যমে জনগণের দীর্ঘদিনের লড়াই ও আকাঙ্ক্ষাকে অপমান করা হচ্ছে।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের শীর্ষ নেতারা ও আইনজীবীরা এই অভিযোগ করেন। আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও চিফ হুইপের সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যের প্রতিবাদে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, যার মধ্যে ১১০টি পাস হলেও গুরুত্বপূর্ণ ৭টি অধ্যাদেশ রহিত এবং ১৬টি অধ্যাদেশ ল্যাপস বা তামাদি করা হয়েছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় গঠন, স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ এই সংস্কারগুলোর জন্যই দেশের মানুষ গত ১৬ বছর লড়াই করেছে এবং রক্ত দিয়েছে। সংসদীয় বিশেষ কমিটিতে এসব বিষয়ে বিরোধী দল নোট অব ডিসেন্ট দিলেও সরকার তা উপেক্ষা করে নিজেদের মতো রিপোর্ট পেশ করেছে এবং আলোচনায় পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে ওয়াদা ভঙ্গ করেছে।

ব্যারিস্টার মোমেন অভিযোগ করেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে সময়ক্ষেপণ করে অধিবেশন ডেকেছে যাতে গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলো নিয়ে পর্যালোচনার সুযোগ না থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বিল পাসের মাত্র কয়েক মিনিট আগে সংসদ সদস্যদের হাতে কপি দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ও ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ নিয়ে সরকার লুকোচুরির আশ্রয় নিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। বিশেষ করে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের মূল কাঠামো পরিবর্তন করে ব্যাংক ডাকাতদের শাস্তির বদলে কেবল একটি অঙ্গীকারনামার বিনিময়ে ব্যাংক ফেরত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এমনকি জুলাই জাদুঘর বিলের ক্ষেত্রেও মন্ত্রীকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং বিরোধী দলের আপত্তির কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এসবের প্রতিবাদেই বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা শেষ পর্যন্ত সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে বাধ্য হন।

সংবাদ সম্মেলনে আইনজীবী শিশির মনির সরকারের বিভিন্ন আইনি ব্যাখ্যার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, গুম অধ্যাদেশ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের সংজ্ঞার অজুহাতে এই আইনটি বাতিল করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও আইনগতভাবে ভিত্তিহীন। এছাড়া মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে আইনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যগুলোও অসত্য বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে গুম কমিশন বা মানবাধিকার কমিশন আইন অকার্যকর থাকায় কেউ গুম হলে প্রতিকার পাওয়ার কোনো আইনি পথ আর খোলা রইল না, যা অত্যন্ত ভয়াবহ একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

বিচারকদের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে শিশির মনির বলেন, বর্তমানে যে আইনে ২৮ জন বিচারককে শোকজ করা হয়েছে, সেই আইনটি সুপ্রিম কোর্ট অনেক আগেই অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করেছে। অথচ আইন মন্ত্রণালয় সেই খবরই রাখে না। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ কেবল সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকা উচিত এবং এজন্য পৃথক সচিবালয় অপরিহার্য। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জনগণ যদি সংস্কারের সুফল না পেয়ে সংসদের ওপর আস্থা হারিয়ে রাজপথে নেমে আসে, তবে তার দায়ভার বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে। রাষ্ট্র মেরামতের যে ম্যান্ডেট জনগণ দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক নয় বলেও জামায়াত নেতারা দাবি করেন।

ইত্তেফাক/এনএন