এক সময়ের প্রবাহমান ঝাড়কাটা নদী এখন ফসলের মাঠ

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১১

জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব ও নাব্যতা সংকটে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার এক সময়ের খরস্রোতা ঝাড়কাটা নদী এখন প্রায় মৃতপ্রায়। শুকিয়ে গিয়ে নদীর অনেক অংশ ফসলের মাঠে পরিণত হয়েছে। তবে কোথাও কোথাও এখনও নদীর চিহ্ন স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

জানা যায়, মাদারগঞ্জ উপজেলার উত্তরাংশ ও ইসলামপুর উপজেলার সীমান্তে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের মোহনা থেকে ঝাড়কাটা নদীর উৎপত্তি। এককালে এটি ছিল প্রবল স্রোতস্বিনী নদী। তীব্র ভাঙনের কারণে নদীর গতিপথ কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে। তখন নদীটি মাদারগঞ্জের উত্তরাংশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চতল নদীর পাশ দিয়ে সরিষাবাড়ি অভিমুখে প্রবাহিত হতো। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ছিল প্রায় ১৩২ মিটার।

সর্পিলাকার এই নদী মাদারগঞ্জ উপজেলার ঝাড়কাটা গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এর নামকরণ ‘ঝাড়কাটা’ হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কেউ কেউ মনে করেন, নদীর উৎসমুখ একসময় ঝাড়কাটা গ্রামের কাছেই ছিল। আবার অনেকে বলেন, চরাঞ্চলে ঝাউঝাড় কাটার জন্য লোকজন সরু নদীপথ ব্যবহার করত, সেখান থেকেই ‘ঝাউ কাটা’ বা ‘ঝাড়কাটা’ নামের উৎপত্তি।

নদীটি মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়ন হয়ে ঘুরে আবার মাদারগঞ্জ উপজেলার মহিষবাথান হয়ে দাঁতভাঙা এলাকায় প্রবেশ করেছে। সেখান থেকে আঁকাবাঁকা পথে গুনারীতলার চতল নদীর কাছ দিয়ে এবং ঝিনাই নদীর পাশ দিয়ে সরিষাবাড়ি উপজেলায় প্রবাহিত হয়ে পৌর এলাকা অতিক্রম করে আওনা ইউনিয়নে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে।

বর্ষা মৌসুমে পানি প্রবাহ বেড়ে নদীটি বিশাল আকার ধারণ করলেও শুষ্ক মৌসুমে এটি অনেকটা সরু খালের মতো হয়ে যায়। পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ায় নাব্যতা কমে গেছে। ফলে অনেক জায়গায় নদী ভরাট হয়ে ফসলি জমিতে পরিণত হয়েছে এবং নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহাবুব ও আমিনুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৫০ ও ৬০-এর দশকে ঝাড়কাটা নদীর ভাঙনে বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হয়ে যায়। একসময় নদীটি এত প্রশস্ত হয়েছিল যে, এটি যমুনা নদীর মতো মনে হতো। নদীপথে বড় বড় নৌকায় হাজার মণ পণ্য পরিবহন করা হতো। পাট ব্যবসায়ীরা এই নদীপথ ব্যবহার করে সহজেই সরিষাবাড়িসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। কিন্তু কয়েক দশকের ব্যবধানে নদীটি প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে।

বর্তমানে ঝাড়কাটা নদীটি কোনোভাবে টিকে থাকলেও অনেকাংশে দখল হয়ে গেছে। নদীর জায়গা দখল করে বসতি গড়ে উঠেছে। কোথাও বাড়িঘর নির্মাণ, আবার কোথাও ফসলি জমি তৈরি করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণেও নদীটি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

মাদারগঞ্জ ও মেলান্দহ উপজেলার সীমান্তবর্তী দাঁতভাঙা এলাকায় ৯০-এর দশকে নদীর ওপর একটি বেইলি সেতু নির্মাণ করা হয়। পরে ঝাড়কাটা সেতু এবং মেলান্দহের গুজামানিকা গ্রামের কাছে একটি স্টিল ব্রিজ নির্মিত হয়। সম্প্রতি আরও একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। দাঁতভাঙা এলাকায় নদীর মধ্যে চর জেগে ওঠায় প্রবাহ কমে গিয়ে নদীটি সরু খালে পরিণত হয়েছে।

পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় মৎস্যসম্পদও হ্রাস পেয়েছে। একসময় এই নদী ছিল দেশীয় প্রজাতির নানা মাছের অভয়ারণ্য। নদীপাড়ে জেলেদের বসতি গড়ে উঠেছিল। কিন্তু নদী মৃতপ্রায় হয়ে পড়ায় মাছসহ জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণবৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইত্তেফাক/এএইচপি