কুশিয়ারা নদীর ভাঙনে পড়েছে সিলেটের সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলা। বিভিন্ন গ্রাম, জনপদ, হাটবাজার, মাদ্রাসা, স্কুল, মসজিদ, দোকানপাট, কৃষিজমি, সড়ক, সাজানো পুকুর, বৃক্ষরাজি, বাঁশবাগানসহ বিভিন্ন অবকাঠামো কুশিয়ারা নদীর ভাঙনের কবলে। এলাকার শত শত মানুষ এখন দিশেহারা।
সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবুল হাসান গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্তাপন করে বলেছেন, ‘জকিগঞ্জের নদী ভাঙন আমাদের ভূখণ্ডের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, অন্যান্য স্থানে নদী ভাঙনে একদিকে ভাঙে অন্যদিক ভরাট হয়। কিন্তু এখানে ভাঙন শুধু জকিগঞ্জের দিকে। তিনি বলেন, পুরোপুরি বর্ষা নামার আগেই ভাঙন ঠেকানো জরুরি। নয় জানমালের ব্যাপাক ক্ষতি হবে। এদিকে তিনি গত ৮ এপ্রিল পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে লেখা পত্রে জকিগঞ্জের ১৯টি স্থানে ভাঙনকবলিত এলাকার নাম উল্লেখ করেছেন, এতে দেখা যায় ১০০ মিটার থেকে ৭০০ মিটার পর্যন্ত ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, কোনো স্থানে নদীতীরে ছোট-বড় অনেক ফটাল সৃষ্টি হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ভারপ্রপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাইসার আলম এলাকা পরিদর্শন করে ইত্তেফাককে বলেন, দীর্ঘ ২৪ বছর আগে নির্মিত ‘আপার সুরমা-কুশিয়ারা প্রকল্প’ প্রতি বছর বন্যার আগে ও পরে মেরামত করতে হয়। ক্ষতিগ্রস্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মেরামত করা না হলে ২০২৬ সালের বন্যায় ব্যাপক এলাকায় নদীতে ভাঙন প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সীদ্ধান্ত হলে কাজ শুরু করব।
বর্ষা এলেই সীমান্তের ওপার থেকে প্রবাহিত বরাক নদের পানি প্রচণ্ড গতিতে নেমে জকিগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করে জকিগঞ্জে। কুশিয়ারার অন্য তীরে ভারত সীমান্তের করিমগঞ্জ জেলা রক্ষায় নদীতীরে শক্ত গ্রোয়েন নির্মাণ করে ভারত ৭১ সালের দিকে। এর ফলে করিমগঞ্জ সুরক্ষিত হয়েছে। আর নদীর সীমানা ক্রমশ বাংলাদেশের দিকে চলে আসায় জকিগঞ্জ বিলীন হচ্ছে। দেখা যায় বাংলাদেশের বিশাল ভূখণ্ড এখন ভারতের করিমগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে। ‘এখুনি উচ্চ পর্যায়ে উদ্যোগ না নিলে একসময় পুরো জকিগঞ্জ ভারত সীমানার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে,’ বলেন জকিগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। তারা নদীর অন্য তীরের চর দেখিয়ে বলেন, ‘ঐখানে তদের বাপ-দাদার কৃষিজমি, ভিটামাটি, নারিকেল ও সুপারিবাগান ছিল। নদীভাঙনে সেগুলো আরেক দেশের।’
সূত্রমতে, জকিগঞ্জের আমলসীদ, গদাধর, জামডহর, হাইদ্রাবন্ধ, বারোজনি, পিলালাকান্দি, লালগ্রাম, সেনাপতির চক, কুনাগ্রাম, মানিকপুর, ছবরিয়া, লোহার মহল, সুপ্রাকান্দি, পরচকসহ মোট ১৯ স্থানের ৮ হাজার ২২০ মিটার নদীভাঙনের কবলে। এসব স্থানে মেরামতের জন্য ৯৬৬ দশমিক ২৭ লাখ টাকার প্রয়োজন। কুনাগ্রামের গ্রামের আব্দুল্লাহ (৪৭) বলেন, ‘আমরা বড়ই অসহায়। নদীর ভাঙন তার বাড়ির পুকুর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এমনকি গ্রামের পাশের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধটিও ক্ষয় হয়ে নিচু হয়ে গেছে। কখন যে পুরো গ্রামই চলে যায় কে জানে।’ তিনি মিনতি করে বলেন, ‘আমাদের গ্রাম, বসতভিটা রক্ষা করুন।’
ভাঙন ঠেকাতে বার বার বরাদ্দ চেয়েও পাওয়া যায়নি :
উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ঢলে সিলেট অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। ২০২৫ সালে বন্যাপরবর্তী সময়ে মেরামত খাতে পর্যাপ্ত টাকা পাওয়া যায়নি। তখন ১০টি স্থানে ৪ দশমিক ৩৬০ কিলোমিটার মেরামতের জন্য ৩৪৯ দশমিক ১০ লাখ টাকা জরুরিভাবে চাওয়া হয়। তাও বরাদ্দ আসেনি। পরে সিলেট-৫ আসনের তত্কালীন সংসদ সদস্যের মৌখিক নির্দেশনায় ১৫টি স্থানের ভাঙন ঠেকাতে ৮২৩ দশমিক ২৪ লাখ টাকা চেয়ে পুনরায় নোটিশ পাঠানো হয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর। তার পর কোনো বরাদ্দ আসেনি। চলতি মৌসুমে এই অরক্ষিত এলাকায় ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কায় এলাকাবাসী, এমনকি পানি উন্নয়ন বোর্ডও শঙ্কিত।
কুশিয়ারার ডান তীরে জকিগঞ্জ বাম তীরে ভারতের করিমগঞ্জ জেলা। জকিগঞ্জের অমলসীদ পয়েন্টে বরাক নদ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে এক ভাগ সোজা নেমে গেছে কুশিয়ারায়, অন্য ভাগ ‘ইউ টার্ন’ নিয়ে সুরমা নাম ধারণ করেছে। বর্ষায় বরাক নদের ৭০ ভাগ পানি জকিগঞ্জ হয়ে কুশিয়ারায় আর ৩০ ভাগ পানি সুরমায় প্রবাহিত হয়। হেমন্তে কুশিয়ারা প্রবহমান থাকলেও সুরমা কানাইঘাটের উজানে শুকিয়ে যায়। তখন সুরমায়, শুধু ‘লোভা ছড়া’ নদীর ঝিরিঝিরি পানির প্রবাহ থাকে। অমলসীদের নিকট নেমে আসা বরাক-সুরমা-কুশিয়ারার তিন মোহনায় বিশাল যে চর জেগেছে; সেটির কারণে শুষ্ক মৌসুমে সুরমা, কুশিয়ারাসহ ভাটির দিকে পানির সংকট তীব্র হয়ে ওঠে।
৪১ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন স্থান ভেঙে পড়েছে :
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সেকশন অফিসার মো. মাহফুজুর রহমান ভূইয়া বলেন, জকিগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর ডান তীরে ৪১ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন স্থান ভেঙে পড়েছে। কোথাও বাঁধ জমির সঙ্গে মিশে গেছে। তাই বাঁধও উঁচু করা প্রয়োজন। ভারতের করিমগঞ্জ এলাকায় কুশিয়ারার তীরে বিশাল এলাকা বিএসএফ নদীতীর জুড়ে চৌকি বসিয়েছে। জকিগঞ্জের ভাঙনকবলিত এলাকাবাসী জানাল, নদীর তীরে ডাইকে কাজ করতে গেলেই বিএসএফ বাধা দেয় সম্পূর্ণ অযৌক্তিভাবে।

