জামালপুরে অযত্ন-অবহেলায় নদীতে পড়ে আছে কয়েক কোটি টাকার সরকারি উদ্ধার নৌযান। বন্যা, নৌ-ডাকাতি, ঘূর্ণিঝড়সহ নদীপথের বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া এসব নৌযান এখন কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘মাল্টি পারপাস অ্যাক্সেসিবল রেসকিউ বোট’ প্রকল্পের মাধ্যমে সারাদেশে মোট ৬৮টি উদ্ধার নৌযান বরাদ্দ দেওয়া হয়। বন্যা ও দুর্যোগপ্রবণ নদী ও হাওরবেষ্টিত জেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
এর অংশ হিসেবে জামালপুর জেলায় চারটি নৌযান বরাদ্দ দেওয়া হয়—জেলা সদরে ‘ব্রহ্মপুত্র-১’, ইসলামপুরে ‘ব্রহ্মপুত্র-২’, সরিষাবাড়িতে ‘ব্রহ্মপুত্র-৩’ এবং দেওয়ানগঞ্জে ‘ব্রহ্মপুত্র-৪’। প্রতিটি নৌযানের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ দুইজন করে গ্রিজার (চালক) ও লস্কর (সহকারী) নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
তবে এক বছর চালুর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় নৌযানগুলোর মূল্যবান সরঞ্জাম খোয়া যায়। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায় সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বেতন-ভাতা। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নৌযানগুলো বর্তমানে অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জামালপুরের ইসলামপুর-দেওয়ানগঞ্জ এবং গাইবান্ধার বালাসীঘাট ও সাঘাটা সীমান্তবর্তী যমুনা নদীর মোরাদাবাদ ঘাট এলাকায় ‘ব্রহ্মপুত্র-২’ ও ‘ব্রহ্মপুত্র-৪’ নামে দুটি নৌযান অবহেলায় পড়ে রয়েছে। নৌযানগুলোর তদারকির জন্য জেলা প্রশাসকের নির্দেশনাসংবলিত একটি নোটিশ সাঁটানো থাকলেও বাস্তবে তেমন কোনো নজরদারি নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ঘাট শ্রমিক দিলু মণ্ডল (৫০) বলেন, “আমার বাড়ির ঘাটেই দুটি সরকারি বোট পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আমি ও আমার স্ত্রী প্রতিদিন পানি সেচে এগুলো ভাসিয়ে রাখছি। না হলে ডুবে যাবে। ৫ আগস্টের পর দুর্বৃত্তরা কিছু মালামাল চুরি করেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের প্রতিরোধ করেছি। এখনো রাত জেগে পাহারা দিচ্ছি। নৌযান দুটি বেঁধে রাখার জন্য লোহার রশিও নেই, আমি নিজ খরচে রশি কিনে বেঁধে রেখেছি।”
সরিষাবাড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শওকত জামিল জানান, তাদের এলাকার নৌযানটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে অধিদপ্তরের আওতায় থাকলেও বর্তমানে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এর ব্যাটারি, ইঞ্জিনসহ বিভিন্ন মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। অন্য নৌযানগুলোর অবস্থাও একই রকম হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এছাড়া জামালপুর শহরের ব্রহ্মপুত্র মরা নদীর তীরে পড়ে থাকা ‘ব্রহ্মপুত্র-১’ নৌযান থেকেও মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জামালপুর জেলা প্রশাসক ইউসুপ আলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরও) আব্দুল্লাহ আল কাফি জানান, জেলার জন্য বরাদ্দ চারটি নৌযানই বর্তমানে অচল অবস্থায় রয়েছে এবং কিছু সরঞ্জাম ইতোমধ্যে খোয়া গেছে। নৌযানগুলো সচল রাখতে কোনো বরাদ্দ না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে অধিদপ্তরে নিয়মিত চিঠিপত্র দেওয়া হচ্ছে। সরকারি সম্পদ চুরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
