আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দেশ গড়তে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সরকারের

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০০

বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক) দেশ গড়ার লক্ষ্যে ২০২৬-২০৩০ মেয়াদে একটি ব্যাপক ও সমন্বিত পঞ্চবার্ষিক মহাপরিকল্পনা বা জাতীয় কৌশল গ্রহণ করেছে সরকার। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো এআই-এর মাধ্যমে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। এই পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশ কেবল প্রযুক্তির আমদানিকারক নয়, বরং এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী এবং উদ্ভাবক হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান শক্ত করবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৬-২০৩০ মেয়াদের এআই পরিকল্পনার প্রধান দিকগুলো হলো—আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে কৃষকদের সহায়তায় ‘কৃষক কার্ড’, পরিবারে নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, এআই-ভিত্তিক প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, সরকারি সেবায় এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, ঢাকার যানজট নিরসনে এআই-চালিত জিরো সিগন্যাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের ব্যবহার। সবার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এআইভিত্তিক স্বাস্থ্য রেকর্ড, শিক্ষার মান বাড়াতে এআইভিত্তিক কানেক্টেড স্কুল ও লার্নিং সিস্টেম, তাত্ক্ষণিক জরুরি অ্যাম্বুলেন্স ও স্বাস্থ্যসেবা, অটোমেশনের মাধ্যমে দ্রুত পুলিশি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এছাড়া এআই পরিচালিত ইমিগ্রেশন সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় ভূমি ও কর ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ও বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিনির্ভর ওয়ান স্টপ সার্ভিস নিশ্চিতের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের হাতে।

টার্গেট ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান: আইসিটি খাতকে দ্রুত সক্রিয় করতে সাইবার নিরাপত্তা, বিপিও, এআই-ডেটা, সেমিকন্ডাক্টর, ‘ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’-সহ পাঁচটি খাতে সরাসরি দুই লাখ এবং ফ্রিল্যান্সিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আরো ৮ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করার কাজ চলমান।

পেপালসহ প্রযুক্তিভিত্তিক ‘ক্যাশ-লাইট’: ফ্রিল্যান্সার ও প্রযুক্তিবিদদের সুবিধার জন্য পেপালসহ একটি জাতীয় ই-ওয়ালেট চালু করা হবে। যাতে দৈনন্দিন কেনাকাটা, বিল, ফি, কর, সবই সহজে ডিজিটালভাবে পরিশোধ করা যাবে।

সবার জন্য ইন্টারনেট : স্কুল-কলেজ, অফিস, গ্রামীণ ডিজিটাল সেন্টার, হাসপাতাল, রেলস্টেশন, এয়ারপোর্টসহ নির্দিষ্ট জনবহুল স্থানে বিনা মূল্যে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা।

আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা: নাগরিকদের তথ্য ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো রক্ষায় জনগণ ও দেশি-বিদেশি স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে নিয়ে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা ও আইন করার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

এআই চালিত ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস: সাইবার আক্রমণ থেকে দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সুরক্ষা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের ডেটা দ্রুত ও নিরাপদে সংরক্ষণ ও বিনিময়ের জন্য বাংলাদেশে একাধিক আধুনিক টিয়ার-৪ ও টিয়ার-৩ ডেটা সেন্টার প্রয়োজন। তাই ‘ক্লাউড-ফার্স্ট’ কৌশলে দেশের প্রথম এআই চালিত ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে চোখ: আইসিটিতে সরকারের দ্বিতীয় পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে, দেশের সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও বিপিও শিল্পকে শক্তিশালী করতে ‘মেইড অথবা অ্যাসেম্বেলড অথবা সার্ভিসড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ চালু করা। এর লক্ষ্য যাতে এসব পণ্য ও সেবা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথম সারিতে প্রতিযোগিতা করতে পারে।

সরকারের কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ইতিমধ্যে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি খাতের বিস্তার ও স্টার্টআপ সংস্কৃতির মাধ্যমে এআইভিত্তিক সমাধান তৈরির চেষ্টা চলছে। কর্মকর্তারা বলেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জীবনমান উন্নয়নের জন্য নীতিনির্ধারণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব জানান, সরকারের বর্তমান তিনটি প্রধান লক্ষ্য কানেক্টিভিটি, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পাবলিক সেক্টরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের মূল ভিত্তিই হলো নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগ। এই কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইএসপি উদ্যোক্তারা আমাদের ফোকাল পয়েন্ট। এ বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, নেটওয়ার্ক ও সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোজন টেলিকম খাতকে প্রচলিত সংযোগসেবার সীমা ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে অপারেটররা ডিজিটাল ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিস্তারে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এআই, সংযোগ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সমন্বয় এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান এ আসাদ বলেছেন, দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যত্ গড়তে আগামী পাঁচ বছরে সরকার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। এগুলো হলো সর্বজনীন কানেক্টিভিটি নিশ্চিত করা। গত ১৩ এপ্রিল রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ব্রডব্যান্ড এক্সপো ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতে অ্যাক্টিভ শেয়ারিং বাস্তবায়নে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।

একই অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ই-গভর্নেন্স, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্রডব্যান্ড অপরিহার্য। তিনি বলেন, সরকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেয়া, ব্রডব্যান্ড সাশ্রয়ী করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। পাশাপাশি প্রতিটি উপজেলায় এআই ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ চালুর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথাও জানান তিনি।

ইত্তেফাক/এএম