যেভাবে উৎপাদিত হয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং কেন এটি ভবিষ্যতের জ্বালানি

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:৫৯

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলো যখন কার্বন-মুক্ত জ্বালানি খুঁজছে, তখন পারমাণবিক শক্তি এক শক্তিশালী সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে। কিন্তু এই বিশাল শক্তি কীভাবে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয় বা এর জ্বালানি চক্রই বা কী—তা নিয়ে সাধারণের কৌতূহল রয়েছে।

পারমাণবিক শক্তি কী?

পারমাণবিক শক্তি হলো মূলত পরমাণুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত শক্তি। এটি দুইভাবে হতে পারে‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ (নিউক্লিয়াস বিভক্ত হওয়া) এবং ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন’ (নিউক্লিয়াস একত্রিত হওয়া)। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রয়েছে, তা মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়।

নিউক্লিয়ার ফিশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একটি বড় পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয় এবং বিপুল শক্তি তৈরি করে।

ধরা যাক, ইউরেনিয়াম-২৩৫-এর নিউক্লিয়াসে একটি নিউট্রন আঘাত করল। তখন সেটি ভেঙে দুইটি ছোট নিউক্লিয়াসে (যেমন বেরিয়াম ও ক্রিপ্টন) পরিণত হয় এবং অতিরিক্ত নিউট্রন বের হয়। এই নিউট্রনগুলো আবার অন্য ইউরেনিয়াম পরমাণুকে ভেঙে দেয়। এভাবে দ্রুত একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি হয় এবং প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়।

ছবিছ আইএইএ

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করে?

একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর-এর ভেতরে এই ফিশন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ দিয়ে পানি গরম করে বাষ্প তৈরি করা হয়। সেই বাষ্প টারবাইন ঘোরায়, আর টারবাইন চালায় জেনারেটর। এর ফলে উৎপন্ন হয় বিদ্যুৎ।

কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই এখানে তাপ থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তবে পার্থক্য হলো, এখানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় পারমাণবিক উপাদান।

ছবি: আইএইএ

ইউরেনিয়াম ও জ্বালানি প্রক্রিয়া

ইউরেনিয়াম একটি ধাতু, যা প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়। এর প্রধান দুটি আইসোটোপ হলো ইউরেনিয়াম-২৩৮ ও ইউরেনিয়াম-২৩৫।

এর মধ্যে ইউরেনিয়াম-২৩৫ দিয়েই ফিশন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব, কিন্তু এর পরিমাণ খুবই কম। তাই ‘সমৃদ্ধকরণ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর পরিমাণ বাড়ানো হয়। এই জ্বালানি কয়েক বছর ব্যবহার করার পরও তেজস্ক্রিয় থাকে, তাই নিরাপদভাবে সংরক্ষণ বা পুনঃব্যবহার করা হয়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কিছু তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হয়, তবে এর পরিমাণ তুলনামূলক কম। এই বর্জ্যগুলোকে বিশেষ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে তা পরিবেশে ক্ষতি না করে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো পুনর্ব্যবহারও করা যায়।

আগামী দিনের ‘উন্নত রিঅ্যাক্টর’ প্রযুক্তি আরও নিরাপদ হবে এবং কম বর্জ্য তৈরি করবে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের পর থেকে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে।

জলবায়ু পরিবর্তনে পারমাণবিক শক্তির ভূমিকা

পারমাণবিক শক্তি একটি স্বল্প-কার্বন নির্গমনকারী উৎস। কয়লা বা গ্যাসের মতো এতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড প্রায় তৈরি হয় না। বিশ্বের মোট স্বল্প-কার্বন বিদ্যুতের বড় একটি অংশই আসে পারমাণবিক উৎস থেকে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সূত্র: আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)

ইত্তেফাক/আইএ