র‌্যাব-পুলিশ বারবার আক্রান্ত হচ্ছে কেন

আপডেট : ২৪ মে ২০২৬, ১৬:৪৭

হঠাত্ করেই র‌্যাব-পুলিশের উপর আক্রমণ বেড়ে গেছে। কোথাও অভিযানে গেলে কখনো মাদক ব্যবসায়ীরা, কখনো রাজনৈতিক দলের কর্মীরা, আবার কখনো সাধারণ মানুষের বাধার মুখে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো? কেনই বা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা? র্যাব বলছে, অভিযানের পরিমাণ অনেকে বেড়েছে। ফলে বিচ্ছিন্ন দুই-একটি ঘটনা ঘটছে। আর পুলিশ বলছে, ১ মে থেকে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। ফলে অভিযানের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। এছাড়া কিছু কিছু মানুষের মধ্যে আইন ভাঙার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ কারণেই এমন হচ্ছে।

সর্বশেষ গতকাল শনিবার খুলনার দাকোপে একটি মাছের ঘের দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও উত্তেজনার জেরে র‍্যাবের গাড়ি ভাঙচুর করে দুই আসামিকে ছিনিয়ে নেয় উত্তেজিত জনতা। যদিও পরে ঐ আসামিদের র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আব্দুল মান্নান খান ও চালনা পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক শেখ মোজাফফর হোসেন বলেন, বিতর্কিত জমিটি মূলত ভূমিহীনদের। র‍্যাব অন্যায়ভাবে মিছিল থেকে লোক তুলে নেওয়ার সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তবে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তারা কিছু জানে না।

শুধু এ মাসেই গতকাল পর্যন্ত ঢাকাসহ ৯ জেলায় অন্তত ১৩টি স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা হয়েছে। এতে আহত হন পুলিশ ও র‍্যাবের অন্তত ৩২ সদস্য। এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম চার মাসে আরো ২১৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। পৃথক ঘটনায় সিলেট ও চট্টগ্রামে মারা গেছেন পুলিশ ও র‍্যাবের দুই সদস্য। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে সারা দেশে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি।

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসের তুলনায় মার্চ ও ফেব্রুয়ারিতে হামলার ঘটনা বেড়েছে। পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় জানুয়ারিতে ৪২, ফেব্রুয়ারিতে ৪২, মার্চে ৬৩ এবং এপ্রিলে ৬৬টি মামলা হয়। এর আগে ২০২৫ সালে পুলিশের ওপর হামলার ৬০১টি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মার্চে সর্বাধিক ৯৬ পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে পট পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় ‘মব’ ও হামলার শিকার হয় পুলিশ। এতে পুলিশের মনোবল ভেঙে যায়। আবার অনেক পুলিশ সদস্য মামলা, সংযুক্তি, প্রত্যাহার ও চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন, এমন আতঙ্কে রয়েছেন। তাই পুলিশ এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। তাই অপরাধীরা মনে করছে, পুলিশ এখনো দুর্বল অবস্থানে আছে, হামলা করলে কিছুই হবে না। এর বিপরীতে তারা নিজেদের শক্তিশালী ভাবছে। তাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র আছে।

গত শুক্রবার সিলেট শহরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে ইমন আচার্য নামে এক র্যাব সদস্য নিহত হয়েছেন। ছিনতাইয়ের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে ধাওয়া করছিল কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি দল। এ সময় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে র্যাব সদস্য ইমন আচার্য তাকে আটক করেন। তখনই ঐ ছিনতাইকারী ধারালো ছুরি দিয়ে ইমনের বুকের বাম পাশে আঘাত করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর ইমনের মৃত্যু হয়।

র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এ জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘সিলেটে যে ছেলেটি মারা গেছে, সে কিন্তু কোনো দায়িত্বে ছিল না। পুলিশ ছিনতাইকারীকে ধাওয়া করেছিল। সে দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে অপরাধীকে ধরতে গিয়ে নিজের জীবন উত্সর্গ করেছে। এটা দায়িত্ব পালনের এক অনন্য নজির। এছাড়া র্যাব সাম্প্রতিককালে অভিযান অনেক বৃদ্ধি করেছে ফলে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে।’  

গত ৫ মে মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের মাসদাইরের বোয়ালিয়া খাল এলাকায় র্যাব-১১ এর একটি গোয়েন্দা দল তথ্য সংগ্রহের কাজ করছিলেন। সে সময় স্থানীয় মাদক চোরাকারবারিরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে আহত হন র্যাব-১১ এর করপোরাল নাজিবুল, কনস্টেবল মাহি ও ইব্রাহিম। র্যাবের গোয়েন্দা টিমের চার সদস্য ঘটনাস্থলে তথ্য সংগ্রহে গিয়ে হামলার মুখে পড়েন। তারা সিভিল পোশাকে ছিলেন। একই দিন রূপগঞ্জ উপজেলায় পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। হামলায় রূপগঞ্জ থানার ওসিসহ পুলিশের সাত সদস্য আহত হয়েছেন।

গত ১৩ মে নাটোরের লালপুরে মাদক কারবারিদের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে স্থানীয় যুবকদের হামলার শিকার হয়েছেন র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার পাঁচ সদস্য। এর আগে গত ১২ মার্চ কক্সবাজারের টেকনাফে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় র‍্যাবের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে র‍্যাবের অন্তত ৯ সদস্য আহত হন। হামলাকারীরা দুটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়।

এদিকে চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়ায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার পুলিশকে ছয় ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বিকাল ৪টার দিকে পুলিশের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ শুরু করে স্থানীয় লোকজন। একপর্যায়ে পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নিতে চান তারা। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেন স্থানীয়রা। পরে রাত সোয়া ১০টার দিকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। 

চলতি মাসে খোদ রাজধানীতেও তিন দফায় আক্রান্ত হয়েছে পুলিশ। সর্বশেষ গত বুধবার দুপুরে পল্লবীর কালশীর বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় সরকারি জমি থেকে অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ অভিযানে হামলার শিকার হয় তারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের উদ্যোগে ওই অভিযানে বস্তির বাসিন্দারা হঠাত্ পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং নিজেদের সুরক্ষায় শেষ পর্যন্ত পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালাতে বাধ্য হন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে।

গত জানুয়ারিতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র‍্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হন। এ ঘটনায় আরো কয়েকজন র‍্যাব সদস্য আহত হন। নিহত র‍্যাব কর্মকর্তার নাম মোতালেব। তিনি ডিএডি পদমর্যাদায় র‍্যাবের পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন।

ইত্তেফাক/এএম