বর্তমান জাতীয় সংসদের ওপর দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী এবং এই সংসদ কোনো সাধারণ প্রক্রিয়ায় নয়, বরং ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই সংসদ যদি জনগণের সেই কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে সাধারণ মানুষ চরমভাবে হতাশ হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকারের বিশেষ সম্মেলনকক্ষে ‘বাংলাদেশ পার্লামেন্ট জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন’ (বিপিজেএ)-এর নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে এক সৌজন্য মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিপিজেএ–এর দপ্তর সম্পাদক তানিম আহমেদের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ সভার বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি হারুন জামিল ও সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী খানের নেতৃত্বে সাংবাদিকদের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এই মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।
সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জনগণের সঙ্গে জাতীয় সংসদের নিবিড় সম্পর্ক থাকতে হবে এবং পেশাদার সাংবাদিকেরা সেই সেতু বন্ধন ও প্রত্যাশা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদ ব্যক্ত করছি।’ দেশের সাংবাদিকতার অতীত ইতিহাস টেনে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, অতীতে বাকশাল আমলে স্বাধীন সাংবাদিকতার যে অপূরণীয় ক্ষতি করা হয়েছিল, তা আজ পর্যন্ত পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি সেই সময়কার তৈরি হওয়া এক ধরণের অদৃশ্য ভীতি ও সেন্সরশিপ থেকে বিগত ২০ বছরেও দেশের সাহসী সাংবাদিকেরা পুরোপুরি বের হয়ে আসতে পারেননি। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, দেশে এখন গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা ও মুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে এবং সংবাদপত্রগুলো কোনো ধরণের ভয়ভীতি ছাড়াই স্বাধীনভাবে সত্য লিখতে পারছে।
বিপিজেএ নেতাদের উপস্থিতিতে স্পিকার বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের দুঃশাসনের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অনেক বড় স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এ দেশের সাধারণ মানুষ দেশটাকে স্বাধীন করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের সেই লালিত স্বপ্নগুলো ক্রমান্বয়ে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিগত শাসনামলে দেশে গুমের সংস্কৃতি চালু হয়েছিল, তৈরি করা হয়েছিল কুখ্যাত “আয়নাঘর”। একই সাথে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে নজিরবিহীন লুটপাট চালানো হয়েছিল, যা আমরা কোনো দিন কল্পনাও করিনি।’ তবে এ দেশের জনগণের মাঝে যে অদম্য শক্তি রয়েছে তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দেশের ছাত্র-তরুণ, তাদের বীর পিতা-মাতা এবং সাধারণ মানুষ যেদিন অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বুক টান করে রাজপথে নেমেছিল, ঠিক সেদিনই স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
সংসদকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর করার বিষয়ে উভয় পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক না কেন, আমাদের মনে রাখতে হবে—সবার উপরে দেশ এবং সবসময় দেশের স্বার্থকেই সবার আগে এগিয়ে রাখতে হবে। বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের মূল কাজই হলো সরকারের যেকোনো ভুলত্রুটির গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং তারা তা মাঠপর্যায়ে ও সংসদে সফলভাবেই করছে। অন্যদিকে, সরকারি দলের প্রধান কাজ হলো সংসদকে পূর্ণ কার্যকর করে দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নেওয়া। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারি ও বিরোধী দল উভয় পক্ষ মিলেমিশে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মাধ্যমে এই সংসদকে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেবে।

