ডা. জাকির নায়েকের ভাষ্য

ইসলামে ধর্ষণের শাস্তি, চার সাক্ষীর ধারণা ভুল

আপডেট : ০৫ জুন ২০২৬, ১৮:১৪

বাংলাদেশে বর্তমানে ধর্ষণের ঘটনা একটি দুরারোগ্য সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ইসলামী শরিয়া আইনের উদাহরণ টেনে অনেকেই অনেক সময় ধর্ষণের শিকার হওয়া একজন নারীর কাছে এটি প্রমাণ করার জন্য চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী দাবি করা এবং তারপর ধর্ষককে শাস্তি দেওয়ার বিধানের কথা বলে থাকেন। এই বিধানটি আসলেই কতটি যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে আলোচিত ইসলামী বক্তা জাকির নায়েকের কাছে প্রশ্ন করা হয়।

আন্তর্জাতিক ইসলামি স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেট টেলিভিশন হুদা টিভিতে প্রচারিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে ডা. জাকির নায়েককে জিজ্ঞেস করা হয়, ধর্ষণের শিকার হওয়া একজন নারীর কাছে এটি প্রমাণ করার জন্য চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী দাবি করা এবং তারপর ধর্ষককে শাস্তি দেওয়া অযৌক্তিক কি না।

উত্তরে ডা. জাকির নায়েক বলেন, অনেক মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে একটি বড় ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, ইসলামি আইনে ধর্ষণ প্রমাণ করার জন্য চারজন সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মানুষ মূলত ব্যভিচার বা জিনার (সম্মতিপূর্ণ অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক) অভিযোগ প্রমাণের শর্তের সাথে ধর্ষণের বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলেছে।

ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নির্দোষ নারীর বিরুদ্ধে জিনা বা ব্যভিচারের অভিযোগ আনে, তবে তার অভিযোগ প্রমাণ করতে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করতে হবে। যদি সে চারজন সাক্ষী আনতে না পারে, তবে উল্টো অভিযোগকারীকে ৮০টি দোররা বা বেত্রাঘাত করা হবে। সুতরাং, এই চারজন সাক্ষীর শর্তটি কেবল ব্যভিচারের অভিযোগ তোলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যদি কেউ দাবি করে যে অমুক পুরুষ বা নারী ব্যভিচার করেছে, তবে তা প্রমাণ করতে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী লাগবে।কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে বিষয়টি মোটেও এমন নয়; কারণ ধর্ষণ এবং জিনা বা ব্যভিচার পুরোপুরি আলাদা বিষয়। জিনা বা ব্যভিচার সংঘটিত হয় উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিতে, পক্ষান্তরে ধর্ষণের ক্ষেত্রে শারীরিক সম্পর্কটি একজনের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়।

এ ধরনের জোরপূর্বক অপরাধের শাস্তির ব্যাপারে ফকিহ বা ইসলামি আইনবিদগণ পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ৩৩ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দেন। যেখানে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং জমিনে ফাসাদ বা নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড, অথবা ক্রুশবিদ্ধকরণ, অথবা বিপরীত দিক থেকে হাত ও পা কেটে ফেলা, অথবা দেশান্তর/নির্বাসন।

কোরআনের এই আয়াতটিতে মূলত ‘হিরাবাহ’ বা নৈরাজ্য বা সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন অস্ত্রের মুখে বা ভয় দেখিয়ে কাউকে জিম্মি করা। ইসলামি আইনবিদদের মতে, ধর্ষণ জমিনে নৈরাজ্য বা সন্ত্রাস সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। কারণ ধর্ষণের ক্ষেত্রেও একজন নারীকে অস্ত্রের মুখে, ভয় দেখিয়ে বা যে কোনোভাবে বাধ্য করে জোরপূর্বক জিনা বা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয়।

ধর্ষণের অপরাধ যদি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্টভাবে প্রমাণি হয়, তবে অপরাধীর শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড (Capital Punishment)। হিরাবাহর ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণে চারজন সাক্ষীর কোনো প্রয়োজন নেই, দুইজন সাক্ষীই যথেষ্ট। এমন কি এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতিগত বা পারিপার্শ্বিক প্রমাণও (Circumstantial Evidence) আমলে নেওয়া হয়। সমস্ত প্রমাণাদি বিবেচনা করে বিচারক যদি শতভাগ নিশ্চিত হন যে অভিযুক্ত ব্যক্তিটিই ধর্ষক, তবে সে মৃত্যুদণ্ড পাবে।

আর যদি বিচারক শতভাগ নিশ্চিত হতে না পারেন, তবে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কিছু নমনীয় শাস্তি দেওয়া যেতে পারে; যেমন কারাদণ্ড, দোররা মারা বা অন্য কিছু। তবে এই ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের জন্য কোরআনে মৃত্যুদণ্ড বা ক্রুশবিদ্ধকরণের মতো কঠোর শাস্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বিচারক যদি মনে করেন সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন, তবে অপরাধীকে ক্রুশবিদ্ধও করা যেতে পারে। ক্রুশবিদ্ধ করার দুটি উপায় রয়েছে; একট হলো তাকে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে লাশটি জনসম্মুখে কোনো খুঁটিতে ঝুলিয়ে রাখা যাতে মানুষ তা দেখে শিক্ষা নিতে পারে, অথবা জীবন্ত অবস্থায় খুঁটিতে বেঁধে রাখা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। এ ছাড়া শাস্তির অন্যান্য উপায়ের মধ্যে রয়েছে বিপরীত দিক থেকে হাত ও পা কেটে ফেলা (যেমন ডান হাত ও বাম পা) অথবা নির্বাসন ও কারাদণ্ড। কিন্তু অপরাধ যদি নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়, তবে শাস্তি কেবলই মৃত্যুদণ্ড এবং এই ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণই যথেষ্ট, চারজন সাক্ষীর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

ইমাম মালেক (রহ.) ও ইমাম শাফেঈর (রহ.) অভিমত হলো, ধর্ষককে নির্ধারিত শারীরিক শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগী নারীকে তার মর্যাদা অনুযায়ী উপযুক্ত মোহর বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং সুফিয়ান সাওরীর (রহ.) মতে, অপরাধীর জন্য নির্ধারিত আইনি শাস্তিই যথেষ্ট, আলাদা কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রয়োজন নেই। মতামত ভিন্ন হলেও ধর্ষণের ক্ষেত্রে চারজন সাক্ষী যে কোনো শর্ত নয়—এ ব্যাপারে সবাই একমত। এ ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক প্রমাণই যথেষ্ট।

স্বয়ং রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুগে মদিনায় একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল, যা সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে। এক নারী অন্ধকার রাতে মসজিদের দিকে নামাজ পড়তে যাচ্ছিলেন। পথে এক ব্যক্তি তার ওপর চড়াও হয়ে তাকে ধর্ষণ করে। নারীটি চিৎকার ও সাহায্য প্রার্থনা করতে থাকেন, কিন্তু ধর্ষক অপরাধ শেষে পালিয়ে যায়। এরপর অন্য এক ব্যক্তি সেই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় ভুক্তভোগী নারী তাকে বলেন যে একজন তার সম্ভ্রমহানি করে ওই দিকে পালিয়ে গেছে। সেই ব্যক্তি তখন ধর্ষককে ধরার জন্য তার পিছু নেন।

এদিকে ওই নারী অন্য একদল মানুষের কাছে গিয়ে তার সাথে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনার কথা বলেন। তখন সেই লোকেরা গিয়ে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে ধরে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দরবারে নিয়ে আসে। ভুক্তভোগী নারীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি ওই ব্যক্তিকে দেখে বলেন, ‘হ্যাঁ, এই লোকটাই আমাকে ধর্ষণ করেছে।’ কিন্তু সে প্রকৃত অপরাধী ছিল না। যখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে যাবেন, তখন প্রকৃত অপরাধী নিজে থেকে সামনে এগিয়ে আসেন এবং বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে আমি তাকে ধর্ষণ করেছি।’তখন আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দোষ লোকটির কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তাকে ছেড়ে দেন। ভুক্তভোগী নারীকে বলেন, ‘তুমি চলে যাও, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন।’ কারণ ভুলবশত তিনি প্রথম ব্যক্তিকে ধর্ষক মনে করেছিলেন, তার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না বা তিনি স্বেচ্ছায় এটি করেননি। আর যিনি প্রকৃত ধর্ষক ছিলেন এবং নিজে এসে অপরাধ স্বীকার করেছিলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে পাথর নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নির্দেশ দেন।

এই ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিন্তু ভুক্তভোগী নারীর কাছে ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী দাবি করেননি। এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতিগত ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণই যথেষ্ট ছিল, যদিও রায় কার্যকরের আগেই প্রকৃত অপরাধী নিজে এসে দোষ স্বীকার করে তওবা করেছিল।

সুতরাং, রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমল থেকেই এটি স্পষ্ট যে, ইসলামে ধর্ষণ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী আনা বাধ্যতামূলক নয়। এটি কিছু মানুষের ভুল ধারণা। ধর্ষণের ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদিই যথেষ্ট এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য অপরাধের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে, অন্যথায় অপরাধের সন্দেহ বা অস্পষ্টতার মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি কিছুটা শিথিল হতে পারে।

ইত্তেফাক/এটিএন