বিদ্যুৎ খাতে ডিজিটাল রূপান্তরকে এগিয়ে নিতে এবং সেবার মান উন্নত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে বিল আদায়ে শৃঙ্খলা আনা, বকেয়া হ্রাস করা এবং গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। ধারণাগতভাবে এটি একটি আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রযুক্তি, যা স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের অভিযোগ, প্রযুক্তিগত সুবিধার পাশাপাশি এই ব্যবস্থা নানা ধরনের আর্থিক চাপ, জটিলতা এবং প্রশাসনিক দুর্ভোগও সৃষ্টি করছে। ফলে যে উদ্যোগকে আধুনিকায়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল, তা আজ অনেক ক্ষেত্রে জনঅসন্তোষ ও প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের সবচেয়ে সাধারণ এবং নিত্যদিনের অভিযোগ হলো রিচার্জ করার সাথে সাথেই একটি বড় অঙ্কের টাকা উধাও হয়ে যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ, একজন সাধারণ গ্রাহক ১,০০০ টাকা রিচার্জ করার পর যখন মিটারের ব্যালেন্সে ৭০০ বা ৮০০ টাকা দেখতে পান, তখন তার মধ্যে এক ধরনের প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়।
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে প্রায়শই ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যে, এই কেটে নেওয়া টাকাগুলো মূলত পূর্ববর্তী বকেয়া, মাসিক ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট, মিটার ভাড়া কিংবা গ্রাহকের নেওয়া কোনো ইমার্জেন্সি ব্যালেন্সের সমন্বয়। যুক্তি হিসেবে এটি গ্রহণযোগ্য হলেও, বিতর্কের মূল জায়গাটি হলো স্বচ্ছতার অভাব। টাকা কাটার এই পুরো প্রক্রিয়াটি গ্রাহকের কাছে স্পষ্ট নয়। কোন খাতে কত টাকা, কেন এবং কীসের ভিত্তিতে কাটা হলো—তার কোনো তাৎক্ষণিক ও বিস্তারিত বিবরণ বা ব্রেকডাউন গ্রাহককে দেওয়া হয় না। ডিজিটাল সেবার মূল শর্তই যেখানে পূর্ণ স্বচ্ছতা, সেখানে এমন অস্পষ্টতা গ্রাহক ও রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আস্থার সংকটকে কেবল ঘনীভূতই করছে।
অ্যানালগ বা পোস্টপেইড মিটারের যুগ থেকে প্রিপেইড মিটারে স্থানান্তরিত হওয়ার পর একটি বিশাল সংখ্যক পরিবারের মাসিক বিদ্যুৎ খরচ প্রায় দেড় থেকে দুই গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ১৫০০ টাকার স্বাভাবিক বিল প্রিপেইড আসার পর কেন হঠাৎ ২৫০০ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি নীতিনির্ধারকদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। যেমন-
মিটরের নির্ভুলতা: পুরনো অ্যানালগ মিটারগুলো সময়ের সাথে সাথে ধীরগতির হয়ে যেত, যা অনেক সময় প্রকৃত ব্যবহারের চেয়ে কম রিডিং দেখাত। নতুন প্রিপেইড মিটারগুলো তুলনামূলকভাবে নিখুঁত ও সংবেদনশীল।
ট্যারিফ স্ল্যাব বা লাইফলাইন পলিসি: বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে 'ট্যারিফ স্ল্যাব' বা ধাপভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ, ব্যবহার যত বাড়বে, প্রতি ইউনিটের দাম তত বৃদ্ধি পাবে। পোস্টপেইড মিটারে মাস শেষে একবারে হিসাব হতো, কিন্তু প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে গ্রাহক অজান্তেই উচ্চ মূল্যের স্ল্যাবে প্রবেশ করে ফেলছেন কি না, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে হিসাব করা দুরূহ।
তবে এর বাইরেও মিটারের সফটওয়্যার কনফিগারেশন ত্রুটি বা কারিগরি অসঙ্গতির সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে কারণেই ট্যারিফ স্ল্যাবের কার্যকারিতা এবং মিটারের অভ্যন্তরীণ গাণিতিক হিসাব পদ্ধতি যাচাইয়ের জন্য একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন কারিগরি অডিটের দাবি এখন সময়ের দাবি।
অ্যানালগ মিটারের আমলে 'ভুতুড়ে বিল' বা কাল্পনিক বিলের সমীকরণ আমরা প্রায়শই দেখতাম, যা মাঠপর্যায়ের মিটার রিডারদের গাফিলতির কারণে হতো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বা ডিজিটাল প্রিপেইড মিটারেও এখন অবাস্তব ও অস্বাভাবিক বিলের অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে আসছে। কোনো কোনো গ্রাহকের মিটারে হঠাৎ করেই স্বাভাবিক ব্যবহারের চেয়ে কয়েক হাজার বা এমনকি লাখ টাকার ঋণ বা বকেয়া দেখানোর ঘটনা ঘটছে।
কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাগুলোকে "কারিগরি ত্রুটি", "সিস্টেম বাগ" বা "ডেটা এন্ট্রি সমস্যা" বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও প্রশ্ন থেকে যায়—যে প্রযুক্তি মানুষের ভুল বা 'হিউম্যান এরর' কমানোর জন্য আনা হলো, তা কেন বারবার একই ধরনের পদ্ধতিগত ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে? গ্রাহক অধিকারকর্মীদের মতে, প্রতিটি ভুতুড়ে বিলের ঘটনায় গ্রাহককে দোষারোপ না করে বিতরণকারী সংস্থার সার্ভার ও সফটওয়্যারের ব্যাক-এন্ড কোডিংয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হওয়া উচিত।
প্রিপেইড মিটার প্রকল্পের স্বচ্ছতা কেবল এর ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর শুরুটা কীভাবে হয়েছে—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে এই মিটারের প্রকৃত মূল্য এবং গ্রাহকের কাছ থেকে আদায়কৃত মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ উঠেছে।
সমালোচকদের মতে, মিটার কেনাকাটার দরপত্র প্রক্রিয়া এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুসরণের দাবি করে, তবুও আমদানিকৃত মিটারের মান এবং দীর্ঘমেয়াদে এই মিটারগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে সংশয় থেকে গেছে। মিটার ভাড়ার নামে গ্রাহকের কাছ থেকে মাসের পর মাস যে অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে, তার যৌক্তিকতা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির মূল দর্শন হলো মানুষের জীবনকে সহজ, গতিশীল ও স্বস্তিদায়ক করা। কিন্তু প্রিপেইড মিটার অনেক ক্ষেত্রে উল্টো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। যেমন-
জটিল ইন্টারফেস ও কোড সিস্টেম: ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স বা বিশেষ প্রয়োজনে মিটারে যে দীর্ঘ সংখ্যার কোড ইনপুট করতে হয়, তা বয়স্ক, সুবিধাবঞ্চিত বা প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ মানুষের জন্য অত্যন্ত জটিল। একটি সংখ্যা ভুল হলেই মিটার লক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
জরুরি মূহূর্তে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা: গভীর রাতে বা ছুটির দিনে হুট করে ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে রিচার্জ করার প্রক্রিয়াটি সব এলাকায় সমানভাবে সহজলভ্য নয়। অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে বা ভেন্ডিং স্টেশন ডাউন থাকলে গ্রাহককে দীর্ঘ সময় অন্ধকারে কাটাতে হয়।
অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা: প্রিপেইড মিটারের কোনো সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যার জনিত সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানের জন্য বিতরণকারী সংস্থার কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়, যা গ্রাহক হয়রানির এক চরম দৃষ্টান্ত।
উত্তরণের উপায় ও সমাধানের পথ:
প্রিপেইড মিটার নিয়ে চলমান এই বহুমুখী সংকট ও জনঅসন্তোষ দূর করতে হলে দ্রুত কিছু কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:
১. স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক অডিট: দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বুয়েটের আইআইসিটি বিভাগ এবং ভোক্তা অধিকার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে প্রিপেইড মিটারিং ব্যবস্থার সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার এবং আর্থিক হিসাব প্রক্রিয়ার একটি নিরপেক্ষ অডিট করা প্রয়োজন।
২. তাৎক্ষণিক বিবরণী: প্রতিবার রিচার্জের পর গ্রাহকের মোবাইল ফোনে এসএমএস-এর মাধ্যমে অথবা একটি ডেডিকেটেড অ্যাপের সাহায্যে প্রতিটি কর্তনের (ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট, বকেয়া ইত্যাদি) স্পষ্ট বিবরণী পাঠাতে হবে।
৩. স্বাধীন তদন্ত কমিশন: অস্বাভাবিক বা ভুতুড়ে বিলের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে এবং দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
৪. সহজ ইউজার ইন্টারফেস: দীর্ঘ কোড ইনপুট করার ঝামেলা কমিয়ে স্মার্ট কার্ড বা আরও সহজ কোনো ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রবর্তন করতে হবে যেন সব শ্রেণির মানুষ সহজে এটি ব্যবহার করতে পারেন।
প্রিপেইড বা স্মার্ট মিটারিং প্রযুক্তি কোনোভাবেই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত নয়; বরং বিশ্বের বহু উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এটি সফলভাবে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে যে কোনো প্রযুক্তির প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে এর সঠিক বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ জবাবদিহি এবং জনবান্ধব নীতিমালার ওপর। বাংলাদেশে প্রিপেইড মিটার ঘিরে যে বিতর্ক, অভিযোগ ও জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা কেবল আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়ে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। যদি কোনো প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তির পরিবর্তে অনিশ্চয়তা, জটিলতা ও আর্থিক উদ্বেগ সৃষ্টি করে, তবে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে পুনর্বিবেচনা জরুরি হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের মৌলিক প্রশ্ন একটাই—তারা কি সত্যিই ব্যবহৃত বিদ্যুতের ন্যায্য মূল্য পরিশোধ করছেন, নাকি কোনো অস্বচ্ছ ও জবাবদিহিহীন ব্যবস্থার ভোগান্তি বহন করছেন?
লেখক: এ এইচ এম ফারুক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

