বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন ও ১৭তম সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐতিহাসিক দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল।
রোববার (৭ জুন) মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের বিসিবি কার্যালয়ে বোর্ড পরিচালক এবং সভাপতি ও সহ-সভাপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অ্যাডহক কমিটির প্রধান হিসেবে গত দুই মাস অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালনের পর, আজ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই সর্বসম্মতিক্রমে বিসিবির নতুন সভাপতি (নির্বাচিত হিসেবে ষষ্ঠ) নির্বাচিত হন তিনি।
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক ও জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তামিম ইকবাল দেশের ক্রিকেটের সামগ্রিক উন্নয়নে এক বিশাল বড় ও সাহসী ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, এখন থেকে দেশের ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোনো ধরনের আপস বা স্যাক্রিফাইস করা হবে না। একই সঙ্গে বিগত এক-দেড় বছরে দেশের ক্রিকেটারসহ ক্রিকেটের সাথে জড়িত স্টেকহোল্ডারদের সম্মানের জায়গায় যে তীব্র ঘাটতি ও অবমাননাকর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংস্কার করার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন নতুন এই বোর্ড সভাপতি।
সংবাদ সম্মেলনে তামিম ইকবাল ক্রিকেটারদের মানবিক মর্যাদা, অধিকার ও খেলার মান উন্নয়নের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ক্রিকেটের ওপরে কোনো ধরনের কোনো আপস করা হবে না। আমাদের দেশের ক্রিকেটারদের যতটুক রেসপেক্ট বা সম্মান করা দরকার, তা নিশ্চিত করা হবে। এটা কেবল বর্তমান জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের জন্য নয়, বরং সাবেক ও উদীয়মান সকল ক্রিকেটার এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতিটি স্টেকহোল্ডার যেন পূর্ণ সম্মান পান, তা আমরা নিশ্চিত করব।
বিগত এক-দেড় বছরে এখানে যে বড় ধরণের ঘাটতি ছিল, সেই ট্র্যাডিশন আমাদের অনতিবিলম্বে ঠিক করতে হবে।’ একই সাথে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দেশের ক্রিকেটের ক্ষুণ্ন হওয়া ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক নানামুখী বিতর্কের কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে রেপুটেশন ড্যামেজ বা সুনাম নষ্ট হয়েছে, এই জিনিসটা আমাদের সম্মিলিতভাবে ঠিকঠাক করতে হবে। এটা আমি একা কোনোভাবেই পারব না, এখানে দেশের সংবাদমাধ্যমসহ ক্রিকেটপ্রেমী সবার নিঃশর্ত সাপোর্ট দরকার।’
বিসিবি সভাপতি হওয়াকে নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন উল্লেখ করে তামিম ইকবাল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার এই স্বপ্নটা অনেক বছর ধরেই ছিল, এমনকি যখন আমি মাঠে খেলতাম তখনও। ওই সময় ক্রিকেটীয় নানা অসঙ্গতি দেখে আমার কাছে মনে হয়েছিল যে, হয়তোবা আমি কোনোদিন এই নীতিনির্ধারণী জায়গায় আসতে পারলে একটা পজিটিভ ডিফারেন্স বা পরিবর্তন আনতে পারব। যেটা এখন আমাকে মাঠের বাইরে কাজ করে প্রমাণ করতে হবে। এটা নিঃসন্দেহে একটি ম্যাসিভ রেসপন্সিবিলিটি বা বিরাট বড় জাতীয় দায়িত্ব। যেহেতু টাইম টু টাইম এসব সংস্কার নিয়ে আমি অতীতে অনেক কথা বলেছি, আমি বলেছি যে আমি এটা করতে চাই, ওটা করতে চাই; নাও ইটস টাইম আই আস্ক মাইসেলফ টু ডেলিভার অর্থাৎ এখন আমার নিজের কাজ করে দেখানোর আসল সময়।’
বোর্ডে সুস্থ নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে গভীর সন্তুষ্টি প্রকাশ করে নতুন সভাপতি বলেন, ‘আমি যে ক্যাটাগরি থেকে পরিচালক পদে নির্বাচন করেছি, সেখানে প্রচণ্ড পরিমাণ কনটেস্ট বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। অনেকে আমাকে আগেই প্যানেল ডিক্লেয়ার করতে বলেছিল। কিন্তু আমি প্যানেল দিলে নির্বাচনটা ওয়ান সাইডেড বা একতরফা হয়ে যেত। প্যানেল না করার সবচেয়ে বড় রিজন ছিল যাতে সব প্রার্থী সমান সুযোগ পায় এবং নির্বাচনটা খুব নাইস ও স্মুথ হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, নবনির্বাচিত ২৫ জন পরিচালকের ব্যক্তিগত আইডেন্টিটি বা রাজনৈতিক পরিচয় যাই থাকুক না কেন, সবার ইনটেনশন বা উদ্দেশ্য যদি ঠিক থাকে, তবেই দেশের ক্রিকেটকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বোর্ডে একাধিক সহ-সভাপতি রাখার পুরোনো প্রথা ভেঙে এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিসিবির একমাত্র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ফাহিম সিনহা। বোর্ডে কেবল একজন সহ-সভাপতি রাখার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তামিম ব্যাখ্যা দেন, ‘আমি নিজে প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে বোর্ডে এখন একজনই ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকবেন। পাস্টের যে এক্সপেরিয়েন্স বা অতীত অভিজ্ঞতা, তাতে একাধিক ব্যক্তি থাকলে অনেক সময় নিজেদের মধ্যে একটা ইগো চলে আসে বা একটা ফাইট চলে আসে। সো আমি চাই না যে বোর্ডে এই ধরনের কোনো নেতিবাচক জিনিস হোক। পুরো বোর্ড আমার এই সংস্কার প্রস্তাবে একমত পোষণ করেছে এবং সবাই হাত তুলে সমর্থন দিয়েছে।’
অন্যদিকে বিসিবি টিভি চালু করার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে তা নাকচ করে বলেন, ‘ভাইয়া, আমার মনে হয় বিসিবি টিভির আগে আমার আরও অনেক বেশি ইম্পর্টেন্ট কাজ আছে।’
পূর্বাচলের নতুন স্টেডিয়াম ও হাই পারফরম্যান্স সেন্টার নিয়ে নিজের বড় স্বপ্নের কথা জানিয়ে তামিম বলেন, ‘হাই পারফরম্যান্স সেন্টার গড়ে তোলা প্রবাবলি আমার বিগেস্ট ড্রিম। পপুলারস নামের একটা কোম্পানি এটাকে আগে ডিজাইন করেছিল। আমি দায়িত্ব পাওয়ার পর ডিজাইনটা দেখে খুব বেশি পছন্দ হয়নি। তাই উনাদেরকে ইনভাইট করেছি, নতুন করে বিশ্বমানের ডিজাইন করা যায় কিনা দেখছি। দ্রুত এই ডিজাইন নিয়ে কাজ করে আমরা আশা করি পূর্বাচলে মূল কাজ স্টার্ট করে দিতে পারব। ইনিশিয়ালি হয়তোবা বিসিবি নিজস্ব ফান্ডিং করে কাজ স্টার্ট করতে পারে, তবে সরকারের সাপোর্টও দরকার।’
বোর্ডের শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে গঠনতন্ত্র পরিবর্তনের আভাস দিয়ে তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেটের মঙ্গলের জন্য যা যা করা দরকার, যদি কোনো গঠনতন্ত্রের চেঞ্জ আনতে হয়, তবে অবশ্যই আমরা তা নিয়ে বোর্ড সভায় আলোচনা করব। আমরা যতটুক বেশি পারি ট্রান্সপারেন্ট বা স্বচ্ছ থাকতে চাই। আমি বা আমার বোর্ড মেম্বাররা এমন কোনো কাজ করুক যেটার জন্য আমরা বিতর্কিত হই, এটা আমি অবশ্যই চাবো না।

