ইসরায়েলে হামলার পর ইরানকে ডোনাল্ড ট্রাম্প

‘ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছেন, যথেষ্ট হয়েছে, এবার টেবিলে আসুন’

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ০৩:৫৯

উত্তর ইসরায়েলের কৌশলগত সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কর্তৃক দফায় দফায় শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অল-আউট যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রোববার মধ্যরাতে ইরান সরাসরি ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করার পরপরই মার্কিন শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘ফক্স নিউজ’ কে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক ও জরুরি প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ইরানকে অবিলম্বে যুদ্ধংদেহী মনোভাব পরিহার করে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তেহরানকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এই ধরনের আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধাবসানের জন্য চলমান আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনায় বিন্দুমাত্র কোনো সহযোগিতা বা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে না। ইরানের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশ্যে সরাসরি পরামর্শ দিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আপনারা আমাদের ওপর এবং আমাদের মিত্রদের ওপর আপনাদের ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছেন, যথেষ্ট হয়েছে; এবার সব ধরণের জেদ ভুলে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে আসুন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নতুন শান্তি চুক্তির শর্তাবলীর ব্যাপারে গভীর মনোযোগ দিন।”

একই সঙ্গে বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করে ট্রাম্প এক বড় ধরনের কূটনৈতিক পূর্বাভাস দিয়ে দাবি করেন, “আমরা এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি চুক্তির একদম শেষ প্রান্তে অর্থাৎ খুব কাছাকাছি আছি। আমি দৃঢ়ভাবে বলব, আগামী সপ্তাহের সোমবার, মঙ্গলবার বা বুধবারের মধ্যেই উভয় পক্ষের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হবে।”

মধ্যপ্রাচ্যের এই সাম্প্রতিক সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল গত শনিবার, যখন লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় ঘনবসতিপূর্ণ শহরতলি দাহিয়েহতে স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় আচমকা এক ভয়াবহ বিমান অভিযান চালায় ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলের সেই বর্বরোচিত বিমান হামলায় ৪ জন নিষ্পাপ শিশুসহ কমপক্ষে ২০ জন সাধারণ লেবানিজ নাগরিক গুরুতর আহত হন।

বৈরুতে ইসরাইলি বিমানবাহিনীর এই আকস্মিক হামলার পর তাৎক্ষণিকভাবে গভীর ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে বলেছিলেন যে, ইসরায়েলের এই একতরফা আগ্রাসনে তিনি বিন্দুমাত্র খুশি বা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। মূলত বৈরুতের সেই আবাসিক এলাকায় ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর চালানো আগ্রাসনের দাঁতভাঙা জবাব দিতেই রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে উত্তর ইসরায়েলের হাইফা অঞ্চলের রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ইরানের এলিট ফোর্স আইআরজিসি।

তাৎক্ষণিকভাবে ইরান ঠিক কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও পরবর্তীতে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, উত্তর ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ইরান কমপক্ষে ১০টি দূরপাল্লার শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, যার সবকটিকেই তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘অ্যারো’ ও ‘আইরন ডোম’ দিয়ে মাঝআকাশেই নিখুঁতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

ইসরায়েলে এই সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করা এক বার্তায় ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অন্যতম শীর্ষ উপদেষ্টা ও প্রভাবশালী নেতা মোহসিন রেজায়ি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে লক্ষ্য করে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সবসময় বৈশ্বিক নীতি মেনে চলে। তবে আমরা বার বার বিশ্বমঞ্চে বলেছি যে, লেবাননে ইসরাইল কর্তৃক আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং সাধারণ মানুষের ওপর এমন নগ্ন আগ্রাসন ইরান কখনোই মুখ বুজে সহ্য করবে না। আজ রাতে আমরা কেবল আগ্রাসনকারীদের সেই অন্যায়ের একটি উপযুক্ত জবাব ও পাল্টা আঘাত দিলাম।”

তিনি আরও যোগ করেন, “তবে আমাদের এই অভিযানটি ছিল অশুভ শক্তির জন্য শুধুমাত্র একটি প্রাথমিক সতর্কবার্তা মাত্র। ইসরাইলি ও মার্কিন অশুভ শক্তি যদি এখনো আমাদের এই চূড়ান্ত সতর্কবার্তা আমলে না নেয়, তবে ইরানের পরবর্তী আঘাত হবে আরও বহুগুণ ব্যাপক এবং এজন্য আগ্রাসনকারীদের ইতিহাসে সবচেয়ে চড়া মূল্য দিতে হবে।”

অন্যদিকে ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তাৎক্ষণিক এক উগ্র ও চরমপন্থী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ইসরায়েলের কুখ্যাত উগ্র ডানপন্থি রাজনীতিবিদ এবং দেশটির বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন গিভর। তিনি নিজের অফিশিয়াল এক্সবার্তায় সম্পূর্ণ যুদ্ধংদেহী ভাষায় সরাসরি হুমকি দিয়ে লিখেছেন, “ইরানের এই ধৃষ্টতার কারণে এবার সরাসরি তেহরানকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেওয়া হবে।” দুই দেশের এমন অনড় অবস্থান ও পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে ট্রাম্পের আসন্ন সপ্তাহের শান্তি চুক্তি কতটুকু আলো দেখবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

ইত্তেফাক/এএম