বর্তমান অর্থবছরের কাঠামো পরিবর্তন করে তা ক্যালেন্ডার ইয়ারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
মঙ্গলবার (৯ জুন) দুপুরে ঢাকার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সংলগ্ন আল–ফালাহ মিলনায়তনে 'জনমুখী বাজেট ২০২৬-২৭ প্রস্তাবনা' শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এই ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) শেষ দুই মাসে তাড়াহুড়া করে অর্থ ব্যয়কে তিনি 'গণলুটপাট' বলে আখ্যায়িত করেন এবং দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, 'আমাদের ফিসক্যাল ইয়ার হচ্ছে জুলাই টু জুন। জুন মাস বর্ষা, খরা, দুর্যোগ, সাইক্লোন—এগুলোতে সাধারণত আমাদের দেশ আক্রান্ত হয়। আমরা লক্ষ করি, এডিপির একটা বিশাল অংশ শেষের দুই মাসে তাড়াহুড়া করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। এটি বাস্তবায়ন নয়। এটি হচ্ছে গণলুটপাট। এর সুফল জনগণ পায় না। কিছু অসৎ সুবিধাভোগীর পকেটে সুফল চলে যায়।'
এ সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি বলেন, 'আমরা সংসদে প্রস্তাব দেব, আমাদের ফিসক্যাল ইয়ারটি ক্যালেন্ডার ইয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে করা হবে। তাহলে বর্ষার পানিতে আমাদের টাকাগুলো ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে না। এই টাকাগুলোর খবর পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ।'
অনুষ্ঠানে জামায়াত আমির দেশের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক সব ক্ষেত্রে নির্লজ্জ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এখন একেবারেই স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংক ও বিমা করপোরেশন পর্যন্ত সর্বত্র এই থাবা বিস্তৃত হচ্ছে। সমাজের যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ বিভিন্নভাবে প্রমাণিত, তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে। এভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক অন্যায্য হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে জাতির গন্তব্য কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সে বিষয়ে তিনি গভীর অনিশ্চয়তার কথা জানান।
বাজেট বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে শফিকুর রহমান সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা উল্লেখ করে বলেন, এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত না হলে সরকার যে বাজেটই দিক না কেন, তা কার্যকর হবে না।
সম্পূরক বাজেট নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন। তার মতে, বছর শেষ হওয়ার ন্যূনতম তিন মাস আগে সংসদে সম্পূরক বাজেট পেশ করা নিয়মের কথা থাকলেও বাস্তবে তা পাওয়া যায় শেষ মাসে। এর ফলে সেই সময়ের মধ্যে বৈধ-অবৈধ ও ন্যায্য-অন্যায্য সব ধরনের খরচ হয়ে যায়, কালো ও সাদা অর্থ একাকার হয়ে পড়ে এবং পরে সম্পূরক বাজেট সংসদে এলে জনগণের আর কোনো লাভ থাকে না।
কর আদায়ের পদ্ধতিকে ত্রুটিপূর্ণ বলে মন্তব্য করে জামায়াত আমির বলেন, জনগণ আসলে তিনটি কর দেয়—একটি ট্রেজারিতে জমা হয়, আরেকটি যায় কর আদায়কারীদের পকেটে এবং তৃতীয়টি চাঁদাবাজদের পকেটে। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন, যার কারণে সরকারের রাজস্ব আয় কমে আসছে। তবে কর আদায়ে সততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসায়ীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আরও বেশি কর দিতে আগ্রহী হবেন বলে তিনি মনে করেন।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, 'ফ্যাসিবাদী সরকারের অপমানজনকভাবে বিদায়ের পর জন–অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে একটি সরকার গঠিত হয়েছিল। তারাও জাতির সঙ্গে ইনসাফ করতে পারেনি। বিভিন্ন কথা এখন অনেকে স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন, তবে সে সময় যাঁরা সরকারে ছিলেন, অনেকে চুপ করে আছেন। তারা যদি ইনসাফ করতেন, আজকের বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। নির্বাচনে জনগণ বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিয়েছেন। ভোট সুষ্ঠু হয়েছে, তবে ফলাফল সুষ্ঠু হয়নি। ইতিমধ্যে আত্মস্বীকৃত বিভিন্ন সাক্ষীও পাওয়া গেছে।'
বর্তমান সরকারের সমালোচনায় তিনি বলেন, সরকার গণভোটকে অস্বীকার করে দুটি শপথের জায়গায় মাত্র একটি শপথ নিয়েছে। দ্বিতীয় শপথ না নেওয়ার ব্যাখ্যায় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচন সম্পন্ন করার স্বার্থে জনগণকে অনেক কিছু বলা হয়েছিল, কিন্তু সেটি তাদের মনের কথা ছিল না। শফিকুর রহমান প্রশ্ন তোলেন, রাজনীতিবিদেরা যদি এভাবে জনগণকে ধোঁকা দেন, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা তৈরি হবে কীভাবে।
অনুষ্ঠানে জামায়াতের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন দলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান। সঞ্চালনা করেন জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমাদ আলী কাসেমী, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি তাসমিয়া প্রধান। জামায়াতের নেতাদের মধ্যে ছিলেন সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম, নায়েবে আমির মজিবুর রহমান এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।

