প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে তুলে নেওয়া হলো সেই সড়কের ইট

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ২৩:০৫

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় আধা কিলোমিটার কাঁচা সড়কে ইট ও বালু ফেলে দ্রুত চলাচল উপযোগী করে তোলে। তবে সফর শেষে ওই সড়ক থেকে ইট অপসারণের ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে অল্প সময়ের মধ্যে সড়কটি প্রস্তুত করতে ভাড়া করা ইট ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে সেই ইট সরিয়ে নেওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি কোনো স্থায়ী সড়ক নির্মাণকাজ ছিল না; বরং ভবিষ্যৎ উন্নয়নকাজের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে সরকারি অর্থায়নে ভাড়া করা উপকরণ ব্যবহার করে এ ধরনের অস্থায়ী সড়ক নির্মাণের বিধান ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌকির খাল হয়ে জিয়াবাড়ী পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার সড়ক পাকাকরণের জন্য আগেই ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজের কার্যাদেশও দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় সড়কটি কার্পেটিং করা হবে।

জানা গেছে, গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সফরে এসে বাগবাড়ী শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। পাশাপাশি চৌকিরদহ খাল খননকাজের উদ্বোধন শেষে তিনি তার পৈতৃক ভিটা জিয়াবাড়ী পরিদর্শনে যান। সফরকে কেন্দ্র করে সড়কটিকে দ্রুত চলাচল উপযোগী করতে অস্থায়ীভাবে ইট ভাড়া নিয়ে সোলিং করা হয়।

সংশ্লিষ্টর ব্যক্তিরা জানান, যেহেতু সড়কটির স্থায়ী উন্নয়ন প্রকল্প আগে থেকেই অনুমোদিত ছিল, তাই দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবহার উপযোগী করার পরিবর্তে সাময়িকভাবে ১০ লাখ টাকায় ইট ভাড়া নিয়ে বিছিয়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সফর শেষে প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে সেই ইট সরিয়ে নেওয়া হয়।

এলজিইডির বগুড়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান বলেন, সড়কটি স্থায়ীভাবে পাকাকরণের জন্য বরাদ্দ আগে থেকেই ছিল। সে কারণে অস্থায়ীভাবে ব্যবহৃত ইট পরে অপসারণ করা হয়েছে। তিনি জানান, ইটগুলো ক্রয় করা হয়নি; ভাড়াভিত্তিক ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়েছিল।

এতে সরকারি অর্থের সাশ্রয় হয়েছে এবং স্থায়ী নির্মাণকাজে কোনো বাধা থাকছে না।
অস্থায়ী সোলিংয়ের দায়িত্বে থাকা আতিকুর রহমান বলেন, ‘এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ী ভাটা থেকে ইট এনে সড়কে বিছানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সেই ইট আবার ভাটায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’ এতে পরিবহন ও শ্রমিক ব্যয় ছাড়া অতিরিক্ত কোনো অপচয় হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।

গাবতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান জানান, প্রকল্পের আওতায় সড়কের উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। কিছু জায়গায় সীমানাসংক্রান্ত জটিলতা থাকায় কাজ শুরুতে বিলম্ব হয়েছে। তবে বর্তমানে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ এবং সড়কের পাশের সুরক্ষামূলক অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী সড়কটির স্থায়ী উন্নয়নের অপেক্ষায় ছিল। এখন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ দৃশ্যমান হওয়ায় তারা আশাবাদী। অনেকেই মনে করছেন, সাময়িক ব্যবস্থার পরিবর্তে স্থায়ী ও টেকসই সড়ক নির্মাণই এলাকার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে বাগবাড়ী ও জিয়াবাড়ী এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বাজারে যাতায়াত আরো সহজ হবে। ফলে এলাকাবাসী দীর্ঘ মেয়াদে এর সুফল ভোগ করতে পারবে।

এদিকে সুশাসনের জন্য প্রশাসন (সুপ্র) বগুড়ার সম্পাদক কে জী এম ফারুক বলেন, একটি কাঁচা সড়ক পাকাকরণের জন্য দরপত্রপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেখানে নতুন করে আর কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করার সুযোগ নেই। শুধু রাষ্ট্রীয় কোনো অতিথির সফরকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ব্যয় রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি করে কাঁচা সড়কে ইট বিছিয়ে প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর সড়ক থেকে ইট তুলে নেওয়ায় চরম ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এ কাজে সরকারি যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেখানো হোক, সেটার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে।

ইত্তেফাক/এমএস