দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে পর্দা উঠছে ২০২৬ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসরকে ঘিরে লাখো দর্শনার্থীর সমাগম ঘটবে তিনটি দেশে। শুধু খেলা আয়োজনই নয়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে আয়োজক দেশগুলো। সেই লক্ষ্যেই মেক্সিকো ও কানাডা যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধে ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
বিশ্বকাপ চলাকালে দর্শনার্থীদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ লাখ কনডম বিতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে মেক্সিকো। একই সময়ে কানাডাও বিশ্বকাপ-থিমভিত্তিক বিশেষ কনডম বিনামূল্যে বিতরণ করবে।
এবারের বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। এই উপলক্ষে লাখো বিদেশি দর্শনার্থীর আগমন প্রত্যাশা করছে মেক্সিকো। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ মনে করছে, বিশ্বকাপ চলাকালে বিপুল সংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও সমর্থকের আগমনের ফলে যৌনবাহিত সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া এবং এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধে আগাম পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এই কর্মসূচির আওতায় বিমানবন্দর, স্টেডিয়াম, হোটেল এলাকা, বার, রেস্তোরাঁ, নাইটক্লাব এবং বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে কনডম ও স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যপত্র বিতরণ করা হবে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বকাপ উপলক্ষে আগত সমর্থকদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ লাখ কনডম বিতরণ করা হবে।
এর আগে কাতার বিশ্বকাপে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক আইনত নিষিদ্ধ হওয়ায় আয়োজকেরা যৌনস্বাস্থ্যবিষয়ক প্রচারণা প্রকাশ্যে পরিচালনা করেননি। তবে মেক্সিকোতে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকোর তিনটি ভেন্যুতে মোট ১৩টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। দেশটির রাজধানী মেক্সিকো সিটি, জালিস্কো এবং মনতেরেতে ৩৯ দিনব্যাপী টুর্নামেন্ট চলাকালে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগগুলোর মাধ্যমে ৪০ থেকে ৫০ লাখ কনডম বিতরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ফেডারেল স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আরও প্রায় ২০ লাখ কনডম বিতরণ করবে।
মেক্সিকোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বাধীন বিশ্বকাপ স্বাস্থ্য পরিচালনা কমান্ডের সদস্য রোকসানা ত্রেহো বলেন, এই উদ্যোগ শুধু কনডম বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল লক্ষ্য হলো নিরাপদ যৌন আচরণ, ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দেওয়া।
তিনি মেক্সিকান সংবাদপত্র এল সল দে মেক্সিকো-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমরা বিমানবন্দর এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশস্থলগুলোতে বিশেষ বুথ স্থাপন করছি, যেখানে মানুষ কনডমের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক তথ্যসম্বলিত লিফলেটও পাবে। কারণ তথ্য ছাড়া কনডম দেওয়া মানে পকেটে শুধু একটি মিষ্টি তুলে দেওয়ার মতো।
রোকসানা ত্রেহো, যিনি ‘হাসপাতালস উইদাউট ইনফেকশনস’ উদ্যোগের মুখপাত্রও, জানান যে শুধু বিমানবন্দর নয়, সমর্থকেরা সাধারণত যেখানে উদ্যাপন করতে যান- সেসব নাইটক্লাব, বার ও রেস্তোরাঁতেও কনডম ও তথ্যপত্র বিতরণ করা হবে।
এছাড়া ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত মেক্সিকো সিটির জোকালো চত্বরে অনুষ্ঠিতব্য ফিফা ফ্যান ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এও বিনামূল্যে কনডম বিতরণ করা হবে।
তিনি বলেন, যৌনমিলনের সময় কনডম ছিঁড়ে গেলে মানুষ এসব কেন্দ্রে গিয়ে পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস (পিইপি) চিকিৎসা নিতে পারবে। সময়মতো এই চিকিৎসা নিলে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
১১ জুন থেকে বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে। তবে মেক্সিকো সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে মোট কত কনডম বিতরণ করবে তা ঘোষণা করেনি। তবে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নির্ধারিত বিতরণকেন্দ্রের পাশাপাশি দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও কনডম বিনামূল্যে পাওয়া যাবে। এসব কেন্দ্র থেকে বছরে ১ থেকে ১ কোটি ১০ লাখ কনডম বিতরণ করা হয়।
এদিকে কানাডাও যৌনস্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। টরন্টো পাবলিক হেলথ তাদের ‘কনডম টু’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বকাপ-থিমভিত্তিক বিশেষ ডিজাইনের কনডম ও অন্যান্য নিরাপদ যৌনস্বাস্থ্য সামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণ করছে। এসব সামগ্রী টরন্টোর চারটি যৌনস্বাস্থ্য ক্লিনিকে পাওয়া যাচ্ছে।
কানাডার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য শুধু রোগ প্রতিরোধ নয়; বরং যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ দূর করা এবং মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে উৎসাহিত করা। তারা মনে করেন, নিরাপদ যৌন আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে যৌনবাহিত রোগ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
বিশ্বকাপকে ঘিরে নেওয়া এই পদক্ষেপগুলো দেখাচ্ছে যে আধুনিক ক্রীড়া আয়োজন এখন শুধু মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ নয়। লাখো মানুষের সমাগমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মেক্সিকো ও কানাডার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতের বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

