রাঙ্গামাটির ভয়াল পাহাড় ধসের ৯ বছর: ১২০ প্রাণের বিনিময়েও বদলায়নি ঝুঁকিপূর্ণ বসতির চিত্র

আপডেট : ১৩ জুন ২০২৬, ১৩:০৬

রাঙ্গামাটিতে স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড় ধসের নয় বছর পূর্ণ হলো আজ শনিবার (১৩ জুন)। ২০১৭ সালের এই দিনে টানা তিন দিনের প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসে সেনা সদস্যসহ ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। নয় বছর পরেও রাঙ্গামাটি জেলায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি কমেনি; বরং বেড়েছে।

জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, ওই বিপর্যয়ে রাঙ্গামাটি সদরে ৬৬ জন, কাউখালীতে ২১ জন, কাপ্তাইয়ে ১৮ জন, জুরাছড়িতে ৬ জন ও বিলাইছড়িতে ২ জনসহ মোট ১১৩ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়। এর মধ্যে ৩৩ জন শিশু, ৩২ জন নারী ও ৪৮ জন পুরুষ। এর বাইরে শহরের মানিকছড়িতে একটি সেনা ক্যাম্পের কাছে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক থেকে মাটি অপসারণ করতে গিয়ে পুনরায় পাহাড় ধসে দুই কর্মকর্তাসহ পাঁচ সেনা সদস্য নিহত হন।

ওই দুর্যোগে শুধু প্রাণহানিই নয়, রাঙ্গামাটির সামগ্রিক অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কসহ রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবান, রাঙ্গামাটি-বড়ইছড়ি ও রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই সড়কের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিভিন্ন আন্তসড়কে ১৪৫টি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। বৈদ্যুতিক গ্রিড লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহরে টানা তিন দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। পানি সংকটে পড়ে পুরো শহর। সেনাবাহিনী ও সড়ক বিভাগের সহযোগিতায় নয় দিন পর সড়ক যোগাযোগ আংশিক স্বাভাবিক হয়। এর আগ পর্যন্ত কাপ্তাই-রাঙ্গামাটি নৌপথে লঞ্চে করে নিত্যপণ্য ও যাত্রী পরিবহন করতে হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৭ সালের ১৩ জুনের পাহাড় ধস ছিল রাঙ্গামাটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ। বনাচ্ছাদিত পাহাড় থেকে শুরু করে বসতিহীন পাহাড় পর্যন্ত সব ধরনের ভূমিতেই মাটি ধসে পড়েছিল। ওই ঘটনা রাঙ্গামাটির ভূপৃষ্ঠকে এতটাই নাজুক করে দিয়েছে যে তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

এরপরেও থামেনি প্রাণহানি। ২০১৮ সালের জুনে নানিয়ারচর উপজেলায় পাহাড় ধসে দুই শিশুসহ ১১ জন এবং ২০১৯ সালের জুনে কাপ্তাইয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলা ও পৌরসভা মিলিয়ে প্রায় ১০০টি এলাকা পাহাড় ধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে রাঙ্গামাটি শহরেই ২৯টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রয়েছে। জেলায় বর্তমানে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছেন।

শহরের রূপনগর এলাকার বাসিন্দা মোমেনা বলেন, 'আমাদের থাকার কোনো জায়গা নেই, গরিব বলেই পাহাড়ে থাকি। বৃষ্টি শুরু হলে ভয় লাগে। তবে বৃষ্টি হলে প্রশাসনের লোকজন আসেন, এরপর আর খবর রাখেন না। সরকার পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করলে যেখানে জায়গা দেবে সেখানে যাব।'

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাঙ্গামাটির সম্পাদক এম জিসান বখতেয়ার বলেন, 'প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই সাইনবোর্ড টানানো, লিফলেট বিতরণ ও জনসচেতনতার কর্মসূচি চলে। এটি কেবল মৌসুমকেন্দ্রিক। বর্ষা কেটে গেলে সবাই চুপ হয়ে যান। এভাবে প্রতি বছর একই কর্মসূচি পালনের পরেও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি কমছে না।'

এ বছরও বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই সতর্কতামূলক উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সাইনবোর্ড স্থাপন ও মাইকিং করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী নিজে শহরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, 'ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ ভূমি ব্যবস্থাপনার কারণে স্থায়ী পুনর্বাসন কিছুটা সময়সাপেক্ষ হলেও এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান লক্ষ্য বর্ষা মৌসুমে প্রাণহানি ঠেকানো।'

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পাহাড়ের ঢালুতে বসতি নির্মাণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা গেলে পাহাড় ধসে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

ইত্তেফাক/এনএন