রয়টার্সের প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি: যুদ্ধের সমাপ্তি নাকি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়?

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ১৮:০০

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ সংঘাতের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হতে যাওয়া সমঝোতা স্মারকটি বন্দুকের গুলি থামিয়ে দিলেও, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্লেষক, কূটনীতিক ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের মতে, এই চুক্তি যুদ্ধের অবসান ঘটালেও শক্তির ভারসাম্য এবং নিরাপত্তা কাঠামোকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

ওয়াশিংটনের ব্যর্থতা ও ইরানের আত্মবিশ্বাস

ওয়াশিংটনের জন্য এই চুক্তি মূলত একটি ব্যয়বহুল ও ব্যর্থ সংঘাত থেকে ‘প্রস্থানপথ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘এপিক ফিউরি’ অভিযান তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা বা পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বরং ইরান রাজনৈতিকভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং অপরাজিত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশটি প্রমাণ করেছে, প্রবল সামরিক চাপের মুখেও তারা নিজেদের কাঠামো ধরে রাখতে সক্ষম এবং আন্তর্জাতিক জলপথ ও জ্বালানি প্রবাহকে হুমকির মুখে ফেলার মতো কৌশলগত সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর সংকট ও নিরাপত্তাহীনতা

এই চুক্তির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুন্নি আরব উপসাগরীয় দেশগুলো। তাদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভিত্তি যে নিরাপত্তা কাঠামো—যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর ছিল তা এখন ভেঙে পড়ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে, ইরানকে নিয়ন্ত্রণ বা উৎখাত করার সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কারোই নেই। ফলে ইরানকে একটি ‘স্থায়ী আঞ্চলিক শক্তি’ হিসেবে মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের ওপর অতিনির্ভরশীলতার পরিবর্তে, এখন উপসাগরীয় রাজধানীগুলো তেহরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সমঝোতার দিকে ঝুঁকছে।

ইসরায়েলের কৌশলগত উদ্বেগ

ইসরায়েলের জন্য এই চুক্তি একটি বড় আঘাত। পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র বিধিনিষেধের মতো ইসরায়েলের মূল দাবিগুলো এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় নেতানিয়াহু সরকারের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় বিরাজ করছে। ইসরায়েল মনে করছে, আলোচনার শর্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব এখন নামমাত্র। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা ও লেবাননের ক্ষেত্রেও ইসরায়েলের ওপর একই ধরনের ‘চুক্তি মেনে নেওয়ার’ চাপ আসতে পারে।

চুক্তির ভবিষ্যৎ: একটি অনিশ্চিত পথ

বিশ্লেষকদের মতে, যা স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে তা কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি নয়, বরং সংঘাত স্তিমিত করার একটি প্রাথমিক কাঠামো। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মাত্রা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণের মতো মূল বিরোধগুলো এখনো অমীমাংসিত। অ্যারন ডেভিড মিলারের ভাষায়, এটি কোনো সমাধান নয়, বরং কেবল ‘আলোচনার টিকিট’।

উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষার কৌশল এখন বৈচিত্র্যময় হচ্ছে। তারা বুঝতে পেরেছে, তাদের অস্তিত্বের জন্য এককভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের ওপর নির্ভর করাটা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। সামগ্রিকভাবে, এই যুদ্ধ শেষ হলেও মধ্যপ্রাচ্য এমন এক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে, যেখানে ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি ভঙ্গুর।

ইত্তেফাক/এএম