তেহরানে বিদেশি বিনিয়োগ টানতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তির রূপরেখায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের একটি বড় বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে এই তহবিলের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে সরাসরি জানেন এমন একটি সূত্র রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে, উভয় পক্ষের মধ্যে স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়াই এই তহবিলের মূল লক্ষ্য। তবে পরিকল্পনাটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। আগামী শুক্রবার ওয়াশিংটন ও তেহরান আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বাহিনীর ইরানে আকস্মিক হামলার পর যুদ্ধ শুরু হয়। গত রোববার দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ থামাতে একটি রূপরেখা চুক্তিতে তারা সম্মত হয়েছেন। এতে ইরানের বন্দরগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সূত্র জানায়, নতুন এই তহবিল কোনো সরকারি ক্ষতিপূরণ বা পুনর্গঠন প্রকল্প নয়। এটি সম্পূর্ণ বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল। এতে সরকারি অনুদান থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় আরব দেশ, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন কোম্পানি এতে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইরানের এক সূত্র রয়টার্সকে বলেন, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য তেহরান প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়েছিল। কিন্তু ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তারা কোনো ক্ষতিপূরণ দেবে না। এরপরই 'রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফান্ড' নামে এই বেসরকারি তহবিলের ধারণা আসে।
আঞ্চলিক দেশগুলো এই তহবিলে ঋণের নিশ্চয়তা, সহজ ঋণ সুবিধা কিংবা সরাসরি অর্থায়নের মাধ্যমে অবদান রাখবে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে মোবারাকেহ স্টিল কারখানা, তেল শোধনাগার, বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
চার দশকের নিষেধাজ্ঞায় বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা ইরানের অর্থনীতিতে এ ধরনের বড় বিনিয়োগ তহবিলকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতদার এবং চতুর্থ বৃহত্তম তেলের মজুতদার। এছাড়া ৯ কোটি ২০ লাখের বেশি তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, পেট্রোকেমিক্যাল, খনিজ সম্পদ, পর্যটন ও কৃষি খাতে ইরানের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, এই বিনিয়োগ তহবিল যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দকৃত ইরানি সম্পদ মুক্ত করার আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। দুটি প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ও সময়সূচি ভিন্ন। চূড়ান্ত ও সন্তোষজনক চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তহবিল কার্যকর হবে না।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের মধ্যে তহবিলের প্রশাসকরা ইরানের কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কাজ করে প্রকল্প নির্বাচন ও পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবেন।
ইরান ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই তহবিল সংক্রান্ত চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারের উল্লেখ করে বলেছেন, ইরান যদি চুক্তির শর্ত মেনে চলে বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস এবং কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শন মেনে নেয় তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নে গঠিত এই তহবিলে ইরান প্রবেশাধিকার পাবে।
এখনো তহবিলটি কীভাবে পরিচালিত হবে বা কারা এর নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা চূড়ান্ত হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কোম্পানি ইতোমধ্যে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
৬০ দিনের এই সমঝোতা কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়, বরং একটি রূপরেখা মাত্র। এ সময়ের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যু, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আরও আলোচনা চলবে।

