যুগ যুগ ধরে নরসিংদীর রায়পুরার চরাঞ্চলের পরিচিত হয়ে উঠেছিল টেঁটাযুদ্ধের জন্য। চরের জনপদের মানুষ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হাতে তুলে নিত টেঁটা, বল্লম, ঢাল কিংবা দেশীয় অস্ত্র। শত শত মানুষের অংশগ্রহণে চলত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সেই ভয়ংকর সংস্কৃতিতে এবার যেন যুক্ত হয়েছে নতুন অস্ত্র বন্দুক।
বুধবার (১৭ জুন) বন্দুক হাতে এক তরুণসহ আরও কয়েকজনের হাতে বন্দুকের ভিডিও এবং ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার ভোরে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার নিলক্ষা ইউনিয়নের দড়িগাঁও গ্রামে দুপক্ষের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।এসময় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারায় অনিক (২০) নামের এক তরুণ। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০জন।
নিহত অনিক দড়িগাঁও পূর্বপাড়া গ্রামের উসমান মেম্বারের ছেলে। বয়স মাত্র বিশ।
এদিকে সংঘর্ষের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন। বুধবার পর্যন্ত চারজন নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যুরই নিশ্চিত তথ্য ও মরদেহ শনাক্ত করতে পেরেছে। অন্যদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দড়িগাঁওয়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর একই বিরোধে সংঘর্ষে নিহত হন ‘মিস্টার গ্রুপের’ সমর্থক প্রবাসী যুবক মামুন। সেই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে গ্রামজুড়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। মামলার আসামি জবা মেম্বার ও তার সহযোগীরা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে থাকলেও থেমে থাকেনি আধিপত্যের লড়াই।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ভাড়াটে লোকজন নিয়ে এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা চলছিল। মঙ্গলবার ভোরে সেই উত্তেজনা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।
অভিযোগ রয়েছে, স্পিডবোটে করে সশস্ত্র লোকজন নিয়ে এলাকায় প্রবেশ করে ‘জবা গ্রুপ’। তাদের প্রতিহত করতে এগিয়ে যায় প্রতিপক্ষ ‘মিস্টার গ্রুপের’ সমর্থকরা। মুহূর্তেই শুরু হয় গোলাগুলি। চোখের পলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো গ্রাম। সেই সংঘর্ষে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন অনিক। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অনিকের মৃত্যুর খবরে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে গ্রামের বাতাস। একটি তরতাজা প্রাণ ঝরে গেল, অথচ বিরোধের আগুন এখনও নেভেনি। ঘটনার পর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন থাকলেও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি।
রায়পুরা থানার ওসি মজিবর রহমান জানান, ওই ঘটনায় আমরা অনিক নামে একজনের মরদেহ শনাক্ত করতে পেরেছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
টেঁটাযুদ্ধ থেকে বন্দুকযুদ্ধ
রায়পুরার নিলক্ষা, বাঁশগাড়ী, মির্জারচর ও পাড়াতলী ইউনিয়নের নাম টেঁটাযুদ্ধের ঘটনায় বারবার আলোচনায় আসে। একসময় এই চরাঞ্চলে সংঘর্ষ মানেই ছিল শত শত মানুষের হাতে টেঁটা, বল্লম ও ঢাল। গোষ্ঠীগত বিরোধ, জমিজমা, আধিপত্য কিংবা সামান্য তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও মুহূর্তের মধ্যে শুরু হতো ভয়ংকর টেঁটাযুদ্ধ। প্রতি বছর এসব সংঘর্ষে প্রাণ হারাত বহু মানুষ। আহত হতো শত শত ব্যক্তি। মামলা, হামলা, প্রতিশোধ আর পাল্টা প্রতিশোধের চক্রে ধ্বংস হয়ে যেত অসংখ্য পরিবার।
কিন্তু এখন দৃশ্যপট বদলেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, টেঁটার বদলে এখন সংঘর্ষ চলাকালে দেখা যাচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। সংঘর্ষে যুক্ত হচ্ছে ভাড়াটে সন্ত্রাসী। আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় প্রাণহানি বাড়ছে আরও ভয়াবহভাবে। যেখানে আগে সংঘর্ষে আহত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল, এখন সেখানে একটি গুলিই কেড়ে নিচ্ছে জীবন।
স্থানীয়দের দাবি, চরাঞ্চলের সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর আরেকটি অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়। নিহতের পরিবার হত্যা মামলা করে শত শত মানুষকে আসামি করে। এরপর আসামিপক্ষ গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর সেই সুযোগে শুরু হয় বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট, গবাদিপশু দখল, ফসল কেটে নেওয়া ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা।
স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘সংঘর্ষের পর বিবাদীপক্ষ এলাকা ছাড়ে। এরপর তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা এখানকার এক ধরনের অলিখিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই। শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’

