প্রযুক্তিনির্ভর বন্ড ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব সুরক্ষায় জোরালো পদক্ষেপ

  • অনলাইনে ইউপি ও লাইসেন্সিং, বন্ড ব্যবস্থাপনায় বাড়ছে স্বচ্ছতা
  • অটোমেশনের সঙ্গে কঠোর তদারকি, বন্ড খাতে বাড়ছে জবাবদিহি
  • অডিটে শুল্ক ফাঁকির চিত্র, বন্ড খাতে স্বচ্ছতা ফেরাতে নতুন উদ্যোগ
আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ১৮:৩২

প্রযুক্তিনির্ভর বন্ড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রাজস্ব সুরক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শতভাগ বন্ড অটোমেশনের অংশ হিসেবে ইউটিলাইজেশন পারমিট (ইউপি) কার্যক্রম অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্ড লাইসেন্স প্রদানসহ সংশ্লিষ্ট প্রায় সব সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। এতে সেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গতি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে অটোমেশন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু হলেও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার এবং শুল্ক ফাঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান এখনো বন্ড সুবিধা ব্যবহার করে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা করছে, যা রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে নজরদারি আরও জোরদার ও অটোমেশন কার্যক্রম কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের প্রকৃত পরিমাণ প্রকাশিত তথ্যের চেয়েও বহুগুণ বেশি হতে পারে। এতে স্থানীয় শিল্প ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

অন্যদিকে বন্ড কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল ও লজিস্টিক সংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান ও অডিট কার্যক্রম পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে মাঠপর্যায়ের তদারকি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না।

সূত্র জানায়, ঢাকার দুই বন্ড কমিশনারেটে বর্তমানে ৪ হাজারেরও বেশি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধার আওতায় পোশাকশিল্পের বিভিন্ন কাঁচামাল—যেমন ফেব্রিক্স, সুতা, রাসায়নিক, রং, প্যাকেজিং উপকরণ, জিপার, বাটন, হ্যাঙ্গার ও ইলাস্টিক—শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করে থাকে।

তবে অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী পর্যাপ্ত জনবল ও যানবাহনের ঘাটতি রয়েছে। ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে অনুমোদিত ২২০ জনের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৩০ জন। একই ধরনের ঘাটতি রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটেও। এতে মাঠপর্যায়ের প্রিভেন্টিভ কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, সীমিত জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট নিয়ে শুল্ক ফাঁকি রোধে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন চাপের মুখে পড়তে হয়। ফলে অনেক সময় অভিযান পরিচালনায় নিরুৎসাহিত হন তারা।

তাদের দাবি, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে ইসলামপুর ও পুরান ঢাকা কেন্দ্রিক বন্ড সিন্ডিকেটের তথ্য থাকলেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও প্রস্তুতির অভাবে নিয়মিত অভিযান চালানো সম্ভব হয় না।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট ৩৫টি প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম চালিয়ে ২০৮ কোটি টাকার অনিয়ম উদ্ঘাটন করেছে এবং ৪৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা আদায় করেছে। একই সময়ে ৭৯০টি প্রতিষ্ঠানের অডিটে আরও ২০৮ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির তথ্য শনাক্ত করা হয়।

এ কমিশনারেটের ৪৪টি মামলা বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, যার সঙ্গে জড়িত রাজস্বের পরিমাণ ২৩৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট ৩০টি প্রিভেন্টিভ কার্যক্রমে প্রায় ১ হাজার ৯২ কোটি টাকার অনিয়ম উদ্ঘাটন করেছে। ১ হাজার ২২টি প্রতিষ্ঠানের অডিটে ১৬৬ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি শনাক্ত করা হয় এবং ৫৩ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে।

রপ্তানি খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রি করছে। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়ীরাও অতিরিক্ত নজরদারি ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)-এর এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বন্ড সুবিধায় আনা পণ্য ট্রাকে করে বিভিন্ন জেলায় নিয়ে গিয়ে পরে রাজধানীর পাইকারি বাজারে সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু ডিজিটালাইজেশন নয়, শক্তিশালী নজরদারি, নিয়মিত অডিট, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং মাঠপর্যায়ের অভিযান জোরদার করলেই বন্ড ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ইত্তেফাক/এমএএম