হত্যা, ধর্ষণসহ নানা গুরুতর অপরাধের মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তদন্ত পর্যায়ে এই জবানবন্দি দেওয়া হলেও তা পায় না আসামি পক্ষ। কেন জবানবন্দি দেওয়া হবে না—তা নিয়ে মামলা গড়ায় উচ্চ আদালতে। দুই বছর আগে সেই মামলা নিষ্পত্তিতে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে হাইকোর্ট। সে কারণে মামলার যাবতীয় নথি পাঠানো হয় প্রধান বিচারপতির দপ্তরে। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন হয়নি।
সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি মো. রহুল কুদ্দুসের নেতৃত্বে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেন। বৃহস্পতিবার বৃহত্তর বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য আসে। শুনানিতে বলা হয়, মামলার আসামি বিচারিক আদালত থেকে খালাস পেয়েছেন। মূল মামলাটি বিচারিক আদালতে নিষ্পত্তি হওয়ায় তদন্ত পর্যায়ে আসামি পক্ষ জবানবন্দির কপি পাবে কি না, তা নিয়ে শুনানি গ্রহণ করা আইনসংগত হবে কি না, সে বিষয়ে আদেশ দেবে হাইকোর্ট। আদালতের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলে মূল বিষয়ের ওপর হাইকোর্টে শুনানি হবে। এ কারণে ২৫ জুন পর্যন্ত শুনানি মুলতুবি করেছে আদালত। মামলার কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট জায়েদ বিন আমজাদ এ তথ্য জানান।
প্রসঙ্গত, জমিতে সীমানা পিলার স্থাপন নিয়ে হামলায় এক জনের মারা যাওয়ার ঘটনায় ২০২০ সালের ৮ জুলাই কুমিল্লার লাকসাম থানায় মামলা করেন পারুল বেগম। মামলার এজাহারে ছয় জনের নাম উল্লেখসহ চার থেকে পাঁচ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। ঐ মামলার আসামি লিংকন ও লিপন পাটোয়ারীকে ঐ বছরের ১৫ অক্টোবর গ্রেফতার করে পুলিশ। ঐদিনই আসামি লিপনকে আদালতে হাজির করলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এই জবানবন্দির সত্যায়িত অনুলিপি চেয়ে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৬ নম্বর আমলি আদালতে আবেদন করে আসামি পক্ষ। বিচারক বেগম শারমিন রীমা আবেদনটি খারিজ করে দেন। খারিজ আদেশে বলা হয়, মামলাটি তদন্তাধীন। দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গোপনীয় বিষয়। এ পর্যায়ে ঐ জবানবন্দির নকল সরবরাহ করা হলে তদন্ত ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই আদেশের বিরুদ্ধে কুমিল্লার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা করেন আসামি। ২০২১ সালের ১২ জানুয়ারি আবেদন খারিজ করে দেন জেলা ও দায়রা জজ মো. আতাবুল্লাহ। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আদেশ বহাল রেখে খারিজ আদেশে তিনি বলেন, মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন এখনো দাখিল হয়নি।
সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী এটা পাবলিক ডকুমেন্টস। যেহেতু তদন্ত চলমান। এখন দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির অনুলিপি দেওয়া হলে তদন্ত কাজ ব্যাহত হতে পারে। নিম্ন আদালতের এই আদেশ বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন আসামি লিপন। ঐ বছরের ৯ মার্চ ঐ আদেশ কেন বাতিল করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে হাইকোর্ট। ২০২৩ সালে মামলাটি রুল শুনানির জন্য বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুসের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চে আসে। রুলের ওপর আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ থেকে শুনানি করা হয়। শুনানিতে উঠে আসে যে, হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চের রায় রয়েছে যে, তদন্ত পর্যায়ে আসামির জবানবন্দি দেওয়া যাবে না। তখন রুলটি হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ জানানো হয় সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ থেকে। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী মামলাটি নিষ্পত্তি করতে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেন। ঐ বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি জাফর আহমেদ ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলম।
প্রসঙ্গত, ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতারকৃত অনেক আসামি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে থাকেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় এই জবানবন্দি রেকর্ড করা হলেও মামলার তদন্ত পর্যায়ের সত্যায়িত অনুলিপি দেওয়া হয় না আসামি পক্ষকে। তবে আসামির জামিন শুনানির সময় এই জবানবন্দির কপির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তীকালীন জামিন শুনানির সময় প্রায়শই রাষ্ট্রপক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় যে, আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রয়েছে। তদন্তের এই পর্যায়ে জামিন দেওয়া ঠিক হবে না। তখন আসামি পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, জবানবন্দিতে কী আছে সেটা আমরা দেখতে চাই। জবানবন্দির কপি আদালতে দাখিল করা হোক। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে এই জবানবন্দির কপি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আসামি পক্ষকে দেওয়া হয় না। তবে আদালত চাইলে তখন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কপি বিচারকের সামনে পেশ করা হয়।

