মুসলিম সাহিত্য সমাজের অন্যতম প্রধান সংগঠক, কবি ও প্রাবন্ধিক আবুল হুসেনের জীবন ও কর্মকে কেন্দ্র করে রচিত জীবনীভিত্তিক উপন্যাস ‘নিষুপ্ত জাগরণ’-এর প্রেক্ষাপট ও সমকালীন মূল্যায়ন শীর্ষক আলোচনা সভা গতকাল ২০ জুন ২০২৬, শনিবার রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৪০১ নম্বর কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক পত্রিকা ‘বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি’ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক এবং বাংলা একাডেমির বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি ও ‘বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য মাহফুজ সালাম। দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, গবেষক, কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।
পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজে আধুনিক সাহিত্যচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশে মুসলিম সাহিত্য সমাজ একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠন তৎকালীন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে নবজাগরণের চেতনা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সাহিত্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সংগঠনের অন্যতম প্রধান সংগঠক আবুল হুসেন ছিলেন সেই মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনের একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করেই কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ শামছুজ্জামান রচনা করেছেন জীবনীভিত্তিক উপন্যাস ‘নিষুপ্ত জাগরণ’। উপন্যাসটি কেবল আবুল হুসেনের ব্যক্তিজীবনের কাহিনি নয়; বরং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলমান সমাজে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আধুনিকতার উন্মেষ, শিক্ষাবিস্তার, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং মুক্তচিন্তার সংগ্রামের একটি সাহিত্যিক দলিল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন কবি ও সম্পাদক সৈকত হাবিব, কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার, লেখক ও শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ পাভেল চৌধুরী, কবি ও সাংবাদিক ইমরান মাহফুজ, কবি ও চিত্রশিল্পী শিশির মল্লিক, কবি ও প্রাবন্ধিক আলমগীর খান এবং সাহিত্যকর্মী তানজুম সাকিব। প্রাবন্ধিক রিয়াজ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সাহিত্যিক নাজনীন সাথী ও কবি অনার্য নাঈম।
আলোচকরা উপন্যাসটির সাহিত্যমান, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, তথ্যনিষ্ঠতা এবং চরিত্র নির্মাণ নিয়ে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, ‘নিষুপ্ত জাগরণ’ ইতিহাস ও কল্পনার সমন্বয়ে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ডকুফিকশন, যা নতুন প্রজন্মকে মুসলিম সাহিত্য সমাজের আদর্শ ও আবুল হুসেনের অবদান সম্পর্কে জানতে সহায়তা করবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বাংলা মুসলিম সমাজের নবজাগরণের ইতিহাস নতুন নতুন মাধ্যমে তুলে ধরার পাশাপাশি সমাজের বৌদ্ধিক বিকাশে সকলকে সচেষ্ট থাকার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে লেখক মোহাম্মদ শামছুজ্জামান আলোচকদের আলোচনায় উঠে আসা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং উপন্যাস রচনার পটভূমি সম্পর্কে আলোকপাত করেন।
সাহিত্যপ্রেমী, গবেষক, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত এ আলোচনা সভা উপন্যাস ‘নিষুপ্ত জাগরণ’ এবং মুসলিম সাহিত্য সমাজের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে বলে উপস্থিত বক্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য, ‘নিষুপ্ত জাগরণ’ উপন্যাসটি ২০২৫ সালে জাগৃতি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়।

