লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত যেভাবে দখলে নিলো ইসরায়েল

আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ১৭:০৯

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক স্থল অভিযানে হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করে লিতানি নদী পর্যন্ত এলাকা দখলে নেওয়ার দাবি করেছেন ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর সপ্তম সাঁজোয়া ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাউল ইসরায়েলি।

রোববার (২১ জুন) প্রকাশিত জেরুজালেম পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ঠিক আগে জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সপ্তম সাঁজোয়া ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাউল ইসরায়েলি বলেন, তার বাহিনী শুধু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সড়ক দখল করেনি, বরং গত ২০ বছরে হিজবুল্লাহ যে বিশাল ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, সেগুলোও নিষ্ক্রিয় করেছে।

কর্নেল ইসরায়েলি এই অভিযানকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের স্থল অভিযানের সবচেয়ে কঠিন প্রকৌশলগত মিশনগুলোর একটি বলে বর্ণনা করেন। খাড়া পাহাড়ি রাস্তা, বিস্ফোরক ফাঁদ, অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা ও মর্টার গোলার মধ্য দিয়ে সেনাদের এগোতে হয়েছে। সামনে ডি-৯ বুলডোজার দিয়ে নতুন পথ তৈরি করে ট্যাংকগুলোকে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।

তিনি স্বীকার করেন, কোনো একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো বাহিনীকে বড় ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারত। লিতানি নদী ও সালুকি উপত্যকায় একসঙ্গে অগ্রসর হওয়ার পথ তৈরি করা ছিল একেবারে নজিরবিহীন। এই সাফল্যের পেছনে ৬০৩তম ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নের সদস্যদের অবদানের প্রশংসা করে তিনি বলেন, তাদের ছাড়া এই অভিযান সম্ভবই হতো না। তারা এমন কাজ করেছে যা আগে অসম্ভব বলে মনে হতো।

অভিযানের শুরুতে সপ্তম ব্রিগেডই প্রথম লড়াইয়ে নামে। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল সীমান্তবর্তী তাইবে, মারকাবা ও রাব এল থালাথিনের মতো গ্রামগুলো দখল করে উত্তর ইসরায়েলে হামলার ঝুঁকি কমানো। পরে গোলানি ব্রিগেড তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এরপর কান্তারা এলাকায় হিজবুল্লাহর সিটি অব রিফিউজ নামে পরিচিত বিশাল ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্র দখলের অভিযান শুরু হয়।

কর্নেলের দাবি, কান্তারায় যে অবকাঠামো পাওয়া গেছে তা প্রায় ২০ বছর ধরে ইরান ও হিজবুল্লাহর সহযোগিতায় গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে অস্ত্রের গুদাম, টানেল, অ্যান্টি-ট্যাংক অবস্থান ও ইসরায়েলে অনুপ্রবেশের জন্য বিশেষ ঘাঁটি ছিল। এই এলাকা লিতানি নদীর দিকে যাওয়ার মূল পথ এবং আশপাশের গ্রামগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করত।

অভিযান চলাকালে তার বাহিনী শত শত আত্মঘাতী ড্রোনের হামলার মুখে পড়ে। বিউফোর্ট ও গান্দুরিয়েহ অঞ্চলেও হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়। তিনি বলেন, সংঘর্ষ এতটাই তীব্র ছিল যে পুরো এলাকা জ্বলছিল। এ সময় অনেক হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে কর্নেল ইসরায়েলি জানান, হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননকে বহুস্তরের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। কিছু অংশ রকেট হামলার জন্য, কিছু সীমান্ত অনুপ্রবেশের জন্য এবং কিছু ইসরায়েলের স্থল অভিযান বিলম্বিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বেশিরভাগ অবকাঠামোই ভূগর্ভে ছিল, যা বিমান হামলা থেকেও সুরক্ষিত।

তার মতে, কান্তারা ও বিউফোর্টে কিছু টানেলের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১.২ কিলোমিটার। গাজার টানেলের তুলনায় লেবাননের এগুলো শনাক্ত করা সহজ ছিল কারণ সেগুলো আকারে বড়।

ড্রোন যুদ্ধ নিয়ে তিনি বলেন, বিস্ফোরকবাহী ড্রোন এখন যুদ্ধক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় হুমকি। ভবিষ্যতে এর ক্ষমতা আরও বাড়বে। তবে প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে এই হুমকি মোকাবিলা সম্ভব।

ট্যাংকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে কর্নেল বলেন, আধুনিক ট্যাংক এখন শুধু সাঁজোয়া যান নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও ড্রোন পরিচালনাসহ একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধব্যবস্থা। ভবিষ্যতেও ট্যাংক গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে সেনা কর্মকর্তাদের ওপর চাপের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, প্রায় তিন বছরের টানা সংঘাতে অনেকেই ক্লান্ত। বিশেষ করে ব্যাটালিয়ন কমান্ডারদের দায়িত্বের মেয়াদ কমানো উচিত। সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি ব্যাটালিয়ন কমান্ডারদের স্ত্রীসহ সেনা পরিবারের সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং বলেন, যুদ্ধের সবচেয়ে ভারী বোঝা আসলে তারাই বহন করছেন।

ইত্তেফাক/এবিএস