সাইবার যৌন হয়রানি, অনলাইনে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, অনুসরণ করে হয়রানি (স্টকিং), ভুয়া পরিচয় ব্যবহার এবং প্রযুক্তিনির্ভর নারী বিদ্বেষমূলক অপরাধের বিচারাধীন মামলাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিলের বিধান নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ ধরনের মামলার নিষ্পত্তি ছাড়াই খারিজ হয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা সাইবার সেফটি আইন, ২০২৬-এর একটি ধারার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
রোববার (২১ জুন) হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ-সংক্রান্ত রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। আদালত জানতে চেয়েছেন, আইনের ৫০(৫) ধারা যেভাবে বিভিন্ন সাইবার অপরাধসংক্রান্ত বিচারাধীন মামলা খারিজ বা বিলুপ্ত করার সুযোগ দিয়েছে, তা কেন আইনগত কর্তৃত্বের সীমা অতিক্রমকারী এবং অকার্যকর ঘোষণা করা হবে না।
আদালতের রুলে একটি নির্দিষ্ট মামলার খারিজ আদেশ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বরিশালের সাইবার ট্রাইব্যুনালে চলমান একটি মামলাকে সংশ্লিষ্ট ধারার ভিত্তিতে খারিজ করার সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও জবাব চাওয়া হয়েছে।
রিট আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে আইনজীবী আবদুল্লাহ আল নোমান জানান, নতুন আইনের বিতর্কিত ধারাটি কার্যকর হওয়ার ফলে পূর্ববর্তী ডিজিটাল ও সাইবার আইনগুলোর অধীনে দায়ের হওয়া বহু মামলা বিচার ছাড়াই বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সাইবার হয়রানি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান, পরিচয় জালিয়াতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানসিক নির্যাতনের মতো অভিযোগের মামলাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, নতুন আইন কার্যকর করার সময় চলমান মামলাগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কোনো অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়ায় থাকা ভুক্তভোগীরা হঠাৎ করেই আইনি প্রতিকার হারানোর আশঙ্কায় পড়েছেন। এতে ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের সংখ্যা বাড়ার এই সময়ে বিচারাধীন মামলাগুলো একযোগে বাতিল হয়ে গেলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে অনলাইন নির্যাতনের ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে ভবিষ্যতে অপরাধ দমনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা মনে করেন, বিষয়টি শুধু একটি আইনি ধারা নিয়ে বিতর্ক নয়; বরং এটি ডিজিটাল নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, ভুক্তভোগীদের বিচারপ্রাপ্তি এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইনের ধারাগুলো সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে আদালতের রুলের ফলে বিতর্কিত ধারাটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে এখন উচ্চ আদালতে বিস্তারিত শুনানির পথ তৈরি হয়েছে। রুলের জবাব পাওয়ার পর বিষয়টি আবারও আদালতে উঠবে এবং তখন এ ধারার ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
আইন বিশ্লেষকদের মতে, এ মামলার রায় ভবিষ্যতে সাইবার অপরাধ, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অনলাইন সহিংসতার বিচার ব্যবস্থার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে এটি আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার ও বিচারপ্রাপ্তির প্রশ্নেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে।

