হলি ওয়াটার কেলেঙ্কারি

ব্রাজিলের খেলোয়াড়কে ঘুমের ওষুধ খাইয়েছিল আর্জেন্টাইনরা 

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ১২:৫৮

দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ফুটবল ম্যাচ মানেই সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় বাড়তি উন্মাদনা। আর সেখানে যদি বিতর্কিত কোনো ঘটনার সম্মিলন থাকে, তাহলে তো কথাই নেই; সমর্থকদের তর্ক এবং আলোচনায় সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় ওই বিষয়গুলোই। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ম্যাচে সবচেয়ে বড় বিতর্কিত ঘটনার জন্ম হয়েছিল ১৯৯০ বিশ্বকাপে। সে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের খেলোয়াড়কে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত পানি খাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল আর্জেন্টাইন ফিজিও'র বিরুদ্ধে। 

ঘটনাটি মূলত ১৯৯০ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচকে কেন্দ্র করে ঘটে। ইতালিতে অনুষ্ঠিত ওই আসরে রাউন্ড অব সিক্সটিনে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল মুখোমুখি হয়। সেই ম্যাচ ঘিরেই ব্রাজিলের এক খেলোয়াড়কে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত পানি খাওয়ানোর অভিযোগ ওঠে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে, যা পরবর্তীতে ‘হলি ওয়াটার’ স্ক্যান্ডাল নামে পরিচিতি পায়।


এখনকার মতো তখনকার সময়েও আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ম্যাচকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ছিল তুমুল উন্মাদনা। ফলে দুদলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও ছিল জয়ের তীব্র মানসিকতা। ১৯৯০ বিশ্বকাপের আগে এই দুই দল বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়েছিল তিনবার। এর মধ্যে ১৯৭৪ ও ১৯৮২ বিশ্বকাপে জিতেছিল ব্রাজিল আর ১৯৭৮ বিশ্বকাপে অনুষ্ঠেয় দুই দলের মধ্যকার ম্যাচটি শেষ হয়েছিলো অমীমাংসিতভাবে। তাই বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবারের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারানোর বড় সুযোগ হিসেবেই এই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার সামনে আসে।
 
তবে আর্জেন্টিনার অবস্থা তখন তেমন ভালো ছিল না। ম্যারাডোনার নৈপূণ্যে আগের বিশ্বকাপটা জিতলেও ওই বিশ্বকাপের অনেক তারকাই ইনজুরি আর খারাপ ফর্মের কারণে ১৯৯০ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা দলে ছিলেন না।
 
এছাড়া বিশ্বকাপের শুরুটাও এমন স্বস্তিদায়ক ছিল না আর্জেন্টিনার। নিজেদের প্রথম ম্যাচেই ক্যামেরুনের কাছে তারা হেরে বসে ১-০ গোলে! গ্রুপপর্বের পরের ম্যাচে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে ২-০ গোলে হারালেও রোমানিয়ার সঙ্গে ম্যাচটা ১-১ গোলে ড্র করে গ্রুপে তৃতীয় হয়ে কোনোমতে রাউন্ড অফ সিক্সটিন নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।
 
অন্যদিকে, ব্রাজিল ছিল ওই বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দল। সেবাস্তিও ল্যাজারনির অধীনে বেশ গোছানো দল নিয়েই সেবার বিশ্ব আসরে এসেছিল সেলেসাওরা। গ্রুপপর্বের সবগুলো ম্যাচ জিতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই রাউন্ড অফ সিক্সটিন নিশ্চিত করে তারা। তাই রাউন্ড অফ সিক্সটিনে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মহারণে ফেভারিট ছিল ব্রাজিলই।
 
১০ জুন তুরিনে অনুষ্ঠিত ম্যাচে অনুমেয়ভাবেই শুরু থেকে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে ব্রাজিল। অন্যদিকে, ফর্মের অভাবে আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই ছিল ব্যাকফুটে। মিডফিল্ডে দুই ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডারের দুঙ্গা ও অ্যালেমাওর দাপটে বলই পাচ্ছিল না আর্জেন্টিনা। কিন্তু জালের দেখা মিলছিল না কোনোমতেই।  
 
ব্রাজিলের টানা আক্রমণে দিশেহারা আর্জেন্টিনার পরিকল্পনার অবশ্য সবটা জুড়েই ছিলেন ম্যারাডোনা। কাউন্টার অ্যাটাকে গোল আদায় করে নেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল তারা। তবে সেদিন শুরু থেকেই ব্রাজিলের ডিফেন্ডার ও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা ম্যারাডোনাকে কড়া পাহাড়ায় রাখায় ম্যারাডোনা ঠিক সুবিধা করতে পারছিলেন না। বিশেষ করে ব্রাজিলিয়ান লেফটব্যাক ব্রাংকো সেদিন অসাধারণ খেলছিলেন, ব্রাংকোকে বেশ কয়েকবার ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলেও ম্যারাডোনা সেটা কিছুতেই করতে পারছিলেন না।
 
দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার পেদ্রো ত্রগলিও আহত হয়ে পড়ায় কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ ছিল। তবে খেলা পুনরায় শুরু হওয়ার পর থেকেই ব্রাংকোকে ঠিক আর আগের মতন চনমনে লাগছিল না, তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, কিছু একটা হয়েছে।  
 
ব্রাংকোর হুট করে এই পরিবর্তনের সুযোগটাই নিলেন ম্যারাডোনা। ৮১ মিনিটে ব্রাংকোকে অনায়াসে ফাঁকি দিয়ে ডানপ্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে গেলেন ম্যারাডোনা। হুট করে ব্রাংকো এভাবে খেই হারানোয় পুরো ম্যাচে অসাধারণ ডিফেন্স করা ব্রাজিলের ডিফেন্সিভ সেটআপ গেলো ভেঙ্গে। ম্যারাডোনাকে ঠেকাতে গিয়ে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডাররা তাকে ঘিরে ধরলে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড ক্লদিও ক্যানিজিয়া হয়ে যান আনমার্কড। ম্যারাডোনাও তাই বল বাড়িয়ে দিলেন ক্যানিজিয়ার দিকে। ব্রাজিলের গোলকিপার তাফারেলকে একা পেয়ে বল জালে জড়াতে ভুল করলেন না ক্যানিজিয়া।  
 
পুরো ম্যাচে আক্রমণে দাপট দেখালেও প্রথম গোলটা পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। তবে গোলের পর থেকেই ব্রাংকোকে অজানা কারণে উত্তেজিত দেখাচ্ছিল, তিনি যেন তার সতীর্থদের কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। ওদিকে মেজাজ হারিয়ে খেলার ৮৫ মিনিটে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ব্রাজিলের অধিনায়ক রিকার্ডো গোমেজ। ম্যাচটাও ব্রাজিল হারে ১-০ গোলে। এই হারে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় হয় ব্রাজিলের, আর্জেন্টিনা উঠে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে।  
 
বিতর্কটা মূলত শুরু হয় ম্যাচ শেষের পর। ম্যাচ শেষে ব্রাংকো দাবি করেন, দ্বিতীয়ার্ধে পেদ্রো ত্রগলিওর ইনজুরির কারণে খেলা যখন বন্ধ ছিল, তখন নাকি আর্জেন্টিনার ফিজিও মিগুয়েল ডি লরেঞ্জোর কাছ থেকে এক বোতল পানি নিয়ে পান করেছিলেন তিনি। আর সেই পানি পান করেই মাথা ঝিমঝিম করছিল ব্রাংকোর এবং অসুস্থতা বোধ করছিলেন!  
 
ব্রাংকো যে আর্জেন্টিনার ফিজিওর আনা পানি খেয়েছিলেন সেটার প্রমাণ রয়েছে। তবে পানিতে কিছু মেশানোর ব্যাপারে এই অভিযোগ প্রমাণের কোনো সুযোগ ছিল না। তাছাড়া ব্রাংকোর এই বক্তব্যের পর আর্জেন্টিনার প্রেস ব্রাংকোর অভিযোগকে উড়িয়ে দিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ করেছিল। তাই অভিযোগটি নিয়ে তখন খুব একটা চর্চা হয়নি। 
 
১৫ বছর পর ২০০৫ সালে এই ঘটনা নিয়ে সবচেয়ে বড় বোমাটা ফাটান ম্যারাডোনা নিজেই। আর্জেন্টিনার এক টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, সেদিন ব্রাংকোকে দেওয়া পানিতে তারা ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিলেন! আর এই বক্তব্যের পরেই পুরনো সেই আগুন আবার জ্বলে ওঠে।  
 
সে সময়কার সিবিএফ সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্টোনিও টেক্সেইরা ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাতে চান। কিন্তু প্রেসিডেন্ট রিকার্ডো টেক্সেইরা অভিযোগ না করার সিদ্ধান্ত নেন। আর তাতে বিষয়টি বেশিদূর এগোয়নি। 
 
ওই ম্যাচের সময়ে আর্জেন্টিনার কোচ কার্লোস বিলার্দোও এই অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং ম্যারাডোনাকে বাস্তবে ফেরার পরামর্শ দেন। এদিকে যে ফিজিওকে নিয়ে এত গণ্ডগোল সেই ফিজিও নিজেও এই ঘটনা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
 
তবে ফিজিওর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন ১৯৯০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড বেবেতো। তিনি বলেন, ‘লরেঞ্জো যদি এ ঘটনা অস্বীকার করে থাকেন তবে তিনি মিথ্যা বলেছেন, লরেঞ্জো পরে আমার কাছে সমস্ত ঘটনা স্বীকার করেছিলেন।’
 
তখনকার ব্রাজিল কোচ এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘এটা কিছুতেই স্পোর্টসম্যানশিপের অংশ হতে পারে না, এটা সম্পূর্ণ নোংরা একটা খেলা। ঘটনা ১৪ বছর আগে হোক বা ১৪ দিন, ফিফার উচিত এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টদের কঠিন শাস্তির আওতায় এনে একটা উদাহরণ স্থাপন করার। কে নিশ্চয়তা দিতে পারে আর্জেন্টিনা অন্য কোনো দলের বিপক্ষে এমন কোনো নোংরা খেলে খেলেনি?’

ইত্তেফাক/আরএইচ