আবারও দিল্লির রাজপথে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ১৩:৩৩

ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্ব পদত্যাগের দাবিতে পুলিশি নিষেধাজ্ঞা ও চরম প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেছে দেশটির তরুণদের জনপ্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জন্ম নেওয়া এই ব্যতিক্রমী নাগরিক আন্দোলনের শত শত সমর্থক দিল্লির তীব্র গরমের মাঝেই গত দুই দিন ধরে রাজপথ ও ফুটপাতে রাত কাটিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা এই ভাইরালের রূপ নেওয়া আন্দোলনের প্রধান প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে চলতি মাসের শুরুতে দেশে ফিরে আসেন। তিনি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের এই তুমুল ক্ষোভকে সরাসরি রাজপথের গণআন্দোলনে রূপান্তর করতে ভারতের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে একের পর এক ছাত্র সমাবেশের ডাক দেন।

ভারতের মোট ১৪০ কোটি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষের বয়সই বর্তমানে ২৫ বছরের নিচে এবং সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ফলাফলের চরম অমিল নিয়ে দেশটির সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও গভীর হতাশা বিরাজ করছে।

তরুণদের এই তীব্র অসন্তোষকে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মঞ্চ দিতেই অভিজিৎ দিপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি গঠন করেন। মূলত গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি তরুণ সমাজকে অবজ্ঞা করে তেলাপোকা বা ককরোচের সঙ্গে তুলনা করে একটি মন্তব্য করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অভিজিৎ দিপকে লিখেছিলেন যে, ‘যদি সব তেলাপোকা একসঙ্গে দলবদ্ধ হয় তবে কেমন হবে?’

তার এই একটি সাধারণ পোস্ট মুহূর্তেই ব্যাপক ভাইরাল হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে গঠিত সিজেপির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের অনুসারী বা ফলোয়ার সংখ্যা বর্তমানে ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে যা বিগত ১২ বছর ধরে দেশটির ক্ষমতায় থাকা মূল শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির মোট ফলোয়ারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।

চলতি জুনের ৬ তারিখে নয়াদিল্লিতে প্রথম বড় ধরনের সমাবেশের পর সিজেপি তাদের এই আন্দোলনকে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু এবং নাগপুরের মতো ভারতের বড় বড় শিল্প ও বাণিজ্যিক নগরীগুলোতে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। 

দিল্লির নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে মধ্যরাতে অবস্থান নেওয়া শচীন কুমার নামের এক আঠারো বছর বয়সী শিক্ষার্থী জানান যে তিনি দীর্ঘ এক বছর কঠোর পরিশ্রম করে গত মাসে দেশের শীর্ষ মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রশ্ন ফাঁসের কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর সরকার ওই পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করলে তিনি মানসিকভাবে চরম ভেঙে পড়েন।

এই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা রোধ করতে ভারত সরকার সাময়িকভাবে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রাম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করলেও দেশের বোদ্ধা ও সমালোচকেরা সরকারের এই পদক্ষেপকে একটি আইওয়াশ বা সাময়িক জোড়াতালির সমাধান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। 

বাতিল হওয়া ওই মেডিকেল পরীক্ষার জন্য গতকাল রোববার দেশজুড়ে প্রায় ১৭ লাখ শিক্ষার্থী পুনরায় পরীক্ষায় বসলেও ক্ষুব্ধ শচীন কুমার পরীক্ষা বর্জন করে দিল্লির এই প্রতিবাদস্থলেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দুই পরীক্ষার মধ্যবর্তী দিনগুলোতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে প্রশ্ন ফাঁসের গ্লানি ও অপমানে এক ডজনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিটি এখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।

প্রতিবাদস্থলে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে বিগত ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই তরুণ প্রজন্ম অন্য কোনো রাজনৈতিক আমল চোখে দেখেনি। 

সরকার বর্তমানের এই তরুণদের প্রতিবাদ দমন করতে গত শনিবার সন্ধ্যা থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টিসহ যন্তর মন্তরে খাবার ও পানির সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তবে পুলিশের সমস্ত দমনপীড়ন ও বাধা উপেক্ষা করে গভীর রাতেও শত শত তরুণ রাজপথের ওপর গোল হয়ে বসে রাজনৈতিক আলোচনা ও হিপ-হপ গানের তালে নেচে তাদের এই অভিনব প্রতিবাদ জারি রেখেছেন।

আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক অভিজিৎ দিপকে এবং তার সমর্থকেরা দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের আনুষ্ঠানিক পদত্যাগ না পাওয়া পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই দিল্লির এই ঐতিহাসিক রাজপথ ছেড়ে যাবেন না।

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিগত ১২ বছরের মোদি সরকারের আমলে কোনো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ করার নজির না থাকলেও দিপকে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, ‘সরকার যদি ভেবে থাকে যে তারা আমাদের এভাবে ক্লান্ত করে মাঠ থেকে তাড়িয়ে দেবে, তবে তারা সম্পূর্ণ ভুলের স্বর্গে বাস করছে; আমরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এখানেই অনড় থাকব।’

সূত্র: আল জাজিরা

ইত্তেফাক/টিএইচ