ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চ শুধু ফুটবলের লড়াই নয়। এটি আবেগ, ইতিহাস, স্বপ্ন আর বাস্তবতারও লড়াই। আজ সোমবার দিবাগত রাত ৩টায় যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় 'আই' গ্রুপের ম্যাচে পরাশক্তি ফ্রান্সের মুখোমুখি হচ্ছে যুদ্ধবিধ্বস্ত এশিয়ার দেশ ইরাক। নিউ ইয়র্কে গ্রুপের আরেক ম্যাচে মঙ্গলবার সকাল ৬টায় লড়বে নরওয়ে ও সেনেগাল।
একদিকে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, যাদের লক্ষ্য শিরোপা। অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাক, যাদের কাছে বিশ্বকাপে ফেরাটাই এক বিশাল অর্জন। ৪০ বছর পর আবার বিশ্বকাপের আলোয় দাঁড়িয়েছে তারা। তাই এই ম্যাচ শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়; এটি দুই ব্যস্ততার মুখোমুখি হওয়া। কাগজে-কলমে এই ম্যাচ একপেশে হওয়ার সব উপকরণই আছে। ফিফা র্যাংকিংয়েও তার স্পষ্ট প্রতিফলন। ফ্রান্স তিন নম্বরে, ইরাক ৫৭তম। ফরাসিরা তাদের প্রথম ম্যাচে সেনেগালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে নকআউটের পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এই ম্যাচে জয় পেলেই শেষ বত্রিশের টিকিট নিশ্চিত হয়ে যাবে।
ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় ভরসা অবশ্যই অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। প্রথম ম্যাচেই জোড়া গোল করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বড় মঞ্চে তিনি কতটা ভয়ংকর। গত বিশ্বকাপ ফাইনালের হ্যাটট্রিকম্যান এবারও দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। এছাড়া ব্রাডলি বারকোলাও গোল করে আক্রমণভাগে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। গ্রুপের শেষ ম্যাচে ফ্রান্স খেলবে নরওয়ের বিপক্ষে। ঐ ম্যাচের আগে গোল ব্যবধান বাড়িয়ে রাখা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণে গোল পার্থক্য বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
ইরাকের বিশ্বকাপ যাত্রা আবেগে ভরা। ১৯৮৬ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেছিল তারা। তারপর দীর্ঘ চার দশক নানা সংকট, যুদ্ধ আর অস্থিরতার কারণে আর বিশ্বমঞ্চে ফেরা হয়নি। অবশেষে সেই প্রত্যাবর্তন ঘটেছে ২০২৬ সালে। কিন্তু শুরুটা সুখকর হয়নি। প্রথম ম্যাচে নরওয়ের কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে তারা। ম্যাচটিতে তাদের রক্ষণভাগের দুর্বলতা যেমন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনি বড় দলের বিপক্ষে কৌশলগত সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। তবুও আশা জুগিয়েছেন আইমান হুসেন। তার গোল অন্তত ইরাকি সমর্থকদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
বাস্তবতা বলছে, এই ম্যাচে মূল প্রশ্ন কে জিতবে তা নয়; বরং ব্যবধান কত হবে! ফ্রান্স যদি শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে পারে, তাহলে ইরাকের রক্ষণে বড় চাপ তৈরি হবে। বিশেষ করে এমবাপ্পের গতি, ফরাসি মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং উইং থেকে দ্রুত আক্রমণ ইরাকের জন্য বড় পরীক্ষাই হতে যাচ্ছে।
তবে ইরাক যদি সংগঠিত রক্ষণ গড়ে তুলতে পারে এবং পালটা আক্রমণে সুযোগ তৈরি করতে পারে, তাহলে সেটাই হবে তাদের বড় অর্জন। সাম্প্রতিক সময়ে ইরাক কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিতও দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-উচ্চগতির, কৌশলগতভাবে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তারা এখনো পিছিয়ে। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফ্রান্স ও ইরাক এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবলে মুখোমুখি হচ্ছে। তাই অতীত পরিসংখ্যানের কোনো গল্প নেই। আছে শুধু বর্তমানের লড়াই।
ফ্রান্সের জন্য এটি আত্মবিশ্বাস আরও বাড়ানোর ম্যাচ। ইরাকের জন্য এটি বাঁচা-মরার লড়াই। হার মানেই ইরাকের বিশ্বকাপ অভিযান কার্যত শেষ। আর জয় পেলে ফ্রান্স নিশ্চিতভাবেই নকআউটে চলে যাবে। বিশ্বকাপের সৌন্দর্য এখানেই। এখানে অসম লড়াইও কখনো কখনো ইতিহাস লিখে ফেলে। ফিলাডেলফিয়ায় প্রশ্ন একটাই-ফ্রান্স কি প্রত্যাশিত জয় তুলে নেবে, নাকি ইরাক লিখবে নতুন এক রূপকথা?

