বৈশ্বিক মন্দাতেও আয় বেড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের

  • এক বছরে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪২৮৭ কোটি টাকা
  • সময়োপযোগী নীতিমালায় বেড়েছে দক্ষতা
আপডেট : ২৪ জুন ২০২৬, ০৭:০০

বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণও। রাজস্ব আয় ও রাজস্ব প্রবৃদ্ধি দুটি ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে বন্দরটি। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, সেবার মান অক্ষুণ্ন রেখে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর মাধ্যমেই এ সাফল্য এসেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বন্দর ব্যবহারকারীদের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী নীতিমালা করা হয়েছে। এতে বন্দরের সক্ষমতা বেড়েছে।

২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের আয়, ব্যয় এবং জমাকৃত অর্থ পর্যালোচনায় দেখা যায়, দুই বছরের ব্যবধানে বন্দরের রাজস্ব উদ্বৃত্ত ৪৪ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত বন্দরের আয় ছিল ৪ হাজার ৯৫২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ২৫ সালের জুলাই থেকে ২৬ সালের মে মাস সময়ে আয় হয়েছে ৬ হাজার ৭৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এক বছরে আয় বেড়েছে ২২ শতাংশের বেশি। আলোচ্য সময়ে ব্যয় কমিয়ে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৮৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। কর প্রদানসহ নানা ব্যয়ের পর মোট রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।

গত পাঁচ বছরের আয়-ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং ব্যয় ছিল ২ হাজার ৩১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ফলে, ঐ বছরে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে, ২০২৪ সালে বন্দরের রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ৭৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, ব্যয় ছিল ২ হাজার ১৫৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং রাজস্ব উদ্বৃত্ত হয় ২ হাজার ৯২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। তার আগের বছরগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালে ২ হাজার ১৪৩ কোটি ১১ লাখ টাকা, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা রাজস্ব উদ্বৃত্ত হয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরের।

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধে কঠোর নীতি অনুসরণের ফলে গত দুই বছর রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি একক অঙ্কে সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৬১ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে তা ছিল ৬.৫০ শতাংশ। তবে ২০২৩ সালে ব্যয় প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.১৮ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ৬.১৭ শতাংশ। জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর সরকারি কোষাগারে ৭ হাজার ৫৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর হিসেবে ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৮ লাখ টাকা, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হিসেবে ৩ হাজার ৪২৭ কোটি ১২ লাখ টাকা টাকা, কর-বহির্ভূত আয় (এনটিআর) হিসেবে ৬০০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নানামুখী চাপের মধ্যেও ২০২৫ সালে সব প্রধান সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। এই এক বছরে কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং, জাহাজ চলাচল, রাজস্ব আয় এবং অবকাঠামো সম্প্র্রসারণ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এসেছে। বিশেষ করে গত এক বছরে ৩৪ লাখ টিইইউএস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একক) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। কনটেইনারে ৪ শতাংশ এবং কার্গো ও জাহাজের ক্ষেত্রে ১১ শতাংশ করে প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বন্দর অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে—যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস। ২০২৪ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউএস। কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৪৪২ টিইইউস। প্রবৃদ্ধির হার ৪.০৭ শতাংশ।

একই বছরে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্গো (পণ্য) হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন। ২০২৪ সালে হয়েছিল ১২ কোটি ৩৯ লাখ ৮৩ হাজার ১৪ টন। বেড়েছে ১ কোটি ৪১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ আমদানি পণ্য নিয়ে জেটিতে আসা এবং রপ্তানি পণ্য নিয়ে জেটি ছেড়ে যাওয়া জাহাজ পরিচালনা করেছে ৪ হাজার ২৭৩টি। ২০২৪ সালে করেছিল ৩ হাজার ৮৫৭টি। জাহাজ হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৪০৬টি, প্রবৃদ্ধির হার ১০.৫০ শতাংশ। এটি কনটেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড। এর আগে, ২০২০ সালে ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭৭, ২০১৯ সালে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ১৮৭, ২০১৮ সালে ২৯ লাখ ৩ হাজার ৯৯৬ এবং ২০১৭ সালে ২৬ লাখ ৬৭ হাজার ২২৩ কনটেইনার পরিবহন করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজন ও ইয়ার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে। জাহাজ ব্যবস্থাপনায় উন্নতির ফলে ২০২৫ সালে বিভিন্ন সময়ে একাধিক দিন বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থান সময় শূন্য ছিল।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র আরো জানায়, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে বেশকিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে বেসরকারি অপারেটরের পরিবর্তে চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। সেখানে দেখা গেছে, তারা কনটেইনার হ্যান্ডলিং প্রায় ১১ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতাও আগের চেয়ে বেড়েছে। কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে বড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে বাল্ক কার্গোর কারণে। সেখানে এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ শতাংশেরও বেশি। বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে অনলাইন ই-মুট পাস, অনলাইন বিল জেনারেশন ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর এক দিনেই সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৭৬১টি ই-মুট পাস ইস্যু করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে কাস্টমসের কলম বিরতি, বিভিন্ন ধর্মঘট, দেশের পরিবর্তনশীল নাজুক পরিস্থিতিতে বিভিন্ন লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু উন্নত অপারেশনাল সক্ষমতার কারণে আমরা সেটাও মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন হয়েছে, বন্দর ব্যবহারকারীদের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী নীতিমালাও করা হয়েছে। এতে বন্দরের সক্ষমতা বেড়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ইউএস কোস্ট গার্ডের পরিদর্শনে ইতিবাচক স্বীকৃতি পাওয়ায় বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন করেছে। অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৭০ হাজার বর্গমিটার ইয়ার্ড নির্মাণ ও নতুন হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প ও ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ের বে-টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর একটি আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, বন্দরের রেকর্ড সাফল্যের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী নেতৃত্ব, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টা। জাহাজের টাার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমানো, বার্থ ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধি, টার্মিনালের উত্পাদনশীলতার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে পণ্য ও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তিনি বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ইয়ার্ড সক্ষমতা বাড়ানোর কারণে জাহাজজট কমানো সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের আমদানি রপ্তানির প্রবৃদ্ধি , বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ বন্দরের কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ, কাস্টমস, শিপিং এজেন্ট, টার্মিনাল অপারেটর ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষতা, উত্পাদনশীলতা ও সেবার মানে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে।

ইত্তেফাক/এনএন