বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষা এবং উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য একটি অস্থায়ী বিশেষ নৌ করিডোর খোলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ওমান।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা বা আইএমও-এর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং সাম্প্রতিক মার্কিন-ইরান শান্তি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই জরুরি সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।
ওমানের দাপ্তরিক সংবাদ সংস্থা ওমান নিউজ এজেন্সির একটি বিশেষ প্রতিবেদনে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি প্রকাশ করা হয়েছে। ওমান প্রশাসনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, ‘বিশ্ব অর্থনীতিতে হরমুজ প্রণালির অপরিসীম গুরুত্ব এবং এই জলপথের প্রতি সুলতানাত অব ওমানের বিশেষ দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে আন্তর্জাতিক আইন ও সমুদ্র আইন মেনে এই নৌ করিডোর চালু করা হয়েছে। প্রণালিতে কোনো ধরনের অতিরিক্ত যাতায়াত কর বা ট্রানজিট ফি আরোপ না করে সব বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওমান আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার সঙ্গে যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে এই অস্থায়ী নৌ করিডোর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে।’
ওমান নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা এবং ওমানের সংশ্লিষ্ট সমুদ্র বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যৌথভাবে নির্ধারিত সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক বা কোঅর্ডিনেটস অনুযায়ী এই বিশেষ করিডোরটি পরিচালনা করা হবে। বিশ্বের যেকোনো দেশের যে সমস্ত বাণিজ্যিক মালবাহী জাহাজ বা জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার এই বিকল্প রুটটি ব্যবহার করতে আগ্রহী, তাদের সমুদ্রযাত্রার পূর্বে অবশ্যই জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থার প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় সম্পন্ন করতে হবে।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক চলাচল ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান এবং ইরান সরকারের মধ্যে বর্তমানে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২৩ জুন) মাস্কাট ও তেহরান যৌথভাবে একটি বিশেষ ওয়ার্কিং গ্রুপ বা যৌথ কার্যনির্বাহী দল গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে।
এই বিশেষ দলটির মূল কাজ হবে পারস্য উপসাগরের অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় সাধন করে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও দেশগুলোর নিজস্ব সার্বভৌম অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নৌ ব্যবস্থাপনা, সেখানে প্রদানযোগ্য সামুদ্রিক পরিষেবা এবং এর আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্ধারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা।
দুই দেশের মধ্যে পূর্বে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী ইরান ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবার বিষয়ে এই সংলাপ পরিচালনা করছে।
ওই বিশেষ শান্তি চুক্তি বা মেমোরেন্ডাম অনুযায়ী ইরান সরকার আগামী ৬০ দিনের জন্য পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই আন্তর্জাতিক রুটে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং কোনো ধরনের শুল্ক বা টোল ছাড়া যাতায়াত নিশ্চিত করতে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর ফলে অবরুদ্ধ হয়ে থাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক শিপিং বা নৌ পরিবহন চলাচল অবিলম্বে পুনরায় চালু করার পথ সুগম হয়েছে।
উল্লেখ্য যে দীর্ঘদিনের মারাত্মক সামরিক সংঘাতের পর গত ১৪ জুন পাকিস্তান সরকারের বিশেষ মধ্যস্থতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান একটি যুগান্তকারী ১৪ দফার শান্তি সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীতে গত ১৮ জুন ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের যৌথ ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকটি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর করা হয়।
এই দ্বিপক্ষীয় ঐতিহাসিক চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে ছিল লেবানন যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর চাপিয়ে দেওয়া দীর্ঘদিনের কঠোর সামুদ্রিক অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

