নতুন উচ্চতায় ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রতি চীনের পূর্ণাঙ্গ আস্থার কথা জানিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। তারেক রহমানের প্রতিক্রিয়াও উচ্চমার্গের। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এবং চীনের সঙ্গে আরও গভীর শিল্প অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী। বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য চীনের ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, কিছুদিনের মধ্যেই চীনা বিনিয়োগকারীদের সুবিধার জন্য দেশটিতে বাংলাদেশের প্রথম 'বিনিয়োগ কার্যালয়' খোলা হবে। সেই আলোকে দু’দেশের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক ও দুটি চুক্তি সই হয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান।
দ্বিপক্ষীয় এ বোঝাপড়া ও সিদ্ধান্তে তারেক রহমানের অভিযাত্রা কূটনীতির পারদে বিবেচিত হচ্ছে, হবেও। বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায় এমন কিছু প্রভাবশালী পরিবারের গল্প, যেখানে ক্ষমতা প্রবাহিত হয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। কোনো দেশে পিতা-মাতার সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে সন্তান গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব, আবার কোথাও স্বামী-স্ত্রীর হাত ধরে সূচিত হয়েছে এক অনন্য রাজনৈতিক ধারা। দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে শুরু করে সুদূর কানাডা কিংবা গ্রিসের রাজনীতিতেও বংশানুক্রমিক দৃঢ় নেতৃত্বের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। একসঙ্গে বাবা-মায়ের পথ-মত মাড়ানো, স্বভাব-বৈশিষ্ট্য ধারণ ও চর্চার ভাগ্য বিশ্বে খুব কমসংখ্যক মানুষেরই ভাগ্যে জোটে। তাও আবার রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি, চলন-বলনসহরাষ্ট্র পরিচালনায়। সেদিক থেকে জ্বলন্ত-টাটকা উদাহরণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সর্বশেষ রাষ্ট্রনীতির সমান্তরালে এর ঝলক মিললো পররাষ্ট্রনীতিতেও।
তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মালয়েশিয়া হয়ে চীন সফর ঝানু কূটনীতিকদের চোখ-চশমায় বিচক্ষণতার এক নিপুন দৃষ্টান্ত। গড়ন-গঠনসহ মা-বাবার আদর্শ ও ব্যক্তিত্বের এক অনন্য মিশ্রণ তার মধ্যে দৃশ্যমান আগে থেকেই। বাবার মতো তারেক রহমানের মধ্যে সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের চেষ্টা স্পষ্ট। জিয়াউর রহমান উদ্যমী হয়ে বিরামহীনভাবে কাজ করেছিলেন এবং সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে তার বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছিলেন, ‘আশার রাজনীতি’ প্রচার করে সব বাংলাদেশিকে আরও কঠোর পরিশ্রম করতে এবং আরও বেশি উৎপাদন করতে ক্রমাগত আহ্বান জানিয়েছিলেন। বাবার পথেই দেখা যাচ্ছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও। বাবার মতো বহুমুখী উন্নয়ন ও উৎপাদনমুখী চিন্তার স্মারক হয়ে মায়ের মতো ধীরস্থির বৈশিষ্ট্য যে কারোই নজর কাড়ছে। প্রতিকূল পরিস্থিতি ও দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়নের মুখে যেভাবে খালেদা জিয়া অবিচল ছিলেন- তারেক রহমানের সে ধরনের ধৈর্য ও দৃঢ় মানসিক শক্তির প্রকাশ লক্ষ্যনীয়। প্রতিকূল সময়েও দলকে সুসংগঠিত রেখে বাবার হাতে গড়া, মায়ের হাতে বিস্তার ঘটানো দলটিকে টিকিয়ে রাখার পেছনে তার সাংগঠনিক দক্ষতা ভিন্নমতের প্রবীণ রাজনীতিকদের কাছে বিশ্লেষণের খোরাক। বিশ্বে অল্প কয়েকটি রাজনৈতিক পরিবার আছে, যাদের একাধিক প্রজন্মের তিন সদস্য কোনো দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমান সেখানে নজির গড়লেন।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান। সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ এস এম সায়েম পদত্যাগ করলে জিয়াউর রহমান হন রাষ্ট্রপতি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান নিজে চেয়ারম্যান হিসেবে থেকে নতুন রাজনৈতিক দল বিএনপি গঠন করেন। ১৯৯১ সালের পর থেকে তার প্রতিষ্ঠিত এ দলটি এবার নিয়ে পাঁচবার রাষ্ট্রক্ষমতাসীন হলো। বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতির তারল্য প্রবাহ, দেশের কূটনৈতিক বিকাশ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের এক সোপান গড়েন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে স্বামী হারানোর পর কোনো পূর্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই বেগম খালেদা জিয়ার কাঁধে এসে পড়ে দল পরিচালনার ভার। সেইসাথে স্বৈরাচার হটানোর আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া। সেই ভারবাহী বেগম খালেদা জিয়া নিজের প্রজ্ঞা, দৃঢ়তা ও নেতৃত্বগুণে বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছে দেন। দুই সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে নিয়ে যার জীবন ছিল নিরাভরণ, সেই নারীই সময়ের পরিক্রমায় হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ও যুগান্তকারী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। রাজনীতিবিদ হিসেবে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন একাধিক সাধারণ নির্বাচনে একাধিক আসনে কখনোই কোনোটিতে পরাজিত হননি। গত ৩০ ডিসেম্বর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন আরো মহীরুহ। গত ডিসেম্বরে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন ছেড়ে যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে দেশে ফিরে মায়ের মৃত্যুর পর তারেক রহমান বিএনপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জাতি দেশ পরিচালনার ভার দেয় তারেক রহমানের কাঁধে। এ অভিযাত্রায় বাবা-মা তার চলার পথে শক্তির আধার। রাজনীতি-অর্থনীতির সমান্তরালে তার কূটনৈতিক পথচলায়ও মুন্সিয়ানা। মাত্র ক’দিন আগে জাতীয় বাজেট ঘোষণার ক্ষেত্রে বাবা জিয়াউর রহমানের ছাপ। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনটি বাজেট ঘোষণা করেছিলেন জিয়াউর রহমান। যার প্রথমটিতেই তিনি শিক্ষা, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়াকে মূলনীতি হিসেবে বেছে নেন। তারেক রহমানের পথচলায়ও সেই কম্পন। সংসদে বাজেট সেশন চলতে চলতেই কূটনীতি তথা তার প্রথম বিদেশ সফর ইস্যু। আঞ্চলিক রাজনীতি ও বিশ্বায়ণদৃষ্টে সফরটি ছিল তার জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। তারেক রহমানও ওই পথ ধরে চীনের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নেয়ার কৌশলে এগোলেন। কূটনীতির পাশাপাশি এ সফরটির পরতে পরতে ছিল অর্থনীতি-বিনিয়োগ-সমৃদ্ধি। বিশ্বের উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশের সম্পর্ক যে কোনো সময়ের চেয়ে উচ্চতায় অবস্থান করছে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১৮ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া বাংলাদেশের শিল্প, অবকাঠামো এবং সেবা খাতে দেশটির বড় বিনিয়োগ রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তার চীন সফর। মালয়েশিয়া হয়ে চার দিনের এ চীন সফরে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের সর্বাত্মক চেষ্টা হয়েছে। চীন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী। দেশটির পররাষ্ট্রনীতি আধিপত্যবাদী নয়। তারা অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে না। সামরিক কৌশলগত কারণেও চীন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ শতাব্দীতে বিশ্বের শীর্ষ নেতৃত্বে অবস্থান নিতে যাওয়া একটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত যৌক্তিক। তারা সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন করে। বাংলাদেশের শিল্প, অবকাঠামো এবং সেবা খাতে তাদের অনেক বিনিয়োগ রয়েছে। বিশাল বাণিজ্যের এ অংশীদারের অংশীদারিত্ব আরো বাড়ানোর আয়োজনের ক্যারিশমা দেখালেন তারেক রহমান। এ বাস্তবতা বুঝে গত এক বছরে বিশ্বের ২৬টি দেশের রাষ্ট্র অথবা সরকারপ্রধানরা চীন সফর করেছেন। এসব দেশের কাছে চীনের নেতৃত্ব ও অর্থনীতির গ্রহণযোগ্যতাই বড় বিষয়। বর্তমান বিশ্বের অনেকেই তাদের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি ভারতও তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনছে। বাংলাদেশের কাছেও তা প্রাসঙ্গিক। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তা বুঝেছিলেন অনেক আগেই। বেগম খালেদা জিয়াও যদ্দূর সম্ভব সেই বাস্তবতায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করেছেন। চীনকে অগ্রাধিকার দিয়ে পররাষ্ট্রনীতির গাঁথুনি মজবুত রেখেছেন। উল্লেখ্য, স্বাধীন বাংলাদেশকে চীন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট। আর কূটনৈতিক সম্পর্ক করে ওই বছরের ৪ অক্টোবর। জিয়াউর রহমান ওই সম্পর্ককে বিরতীহীনভাবে এগিয়ে নেন। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে তিনি চীন সফর করেন। যার ধারাবাহিকতায় অবকাঠামো, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সামরিক খাতে সহযোগিতার দরজা খোলে।
তারেক রহমানের হাত ধরে এখন সেই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়। তারেক রহমানের পদক্ষেপেও জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির লক্ষন। দেশের উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের নীতি। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বিআরআইর অধীনে বাংলাদেশে পদ্মা সেতু, রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মহাসড়ক নির্মাণসহ বড় বড় অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ রয়েছে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল। চীনকে বলা হয় বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থনীতি। কিন্তু গত ১৫ বছর একমুখী এবং এককেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশকে ভুগিয়েছে। এখন সেই ভোগান্তি কাটানো ও লোকসান পুষিয়ে নেয়ার পর্ব। চীন পৌছার আগে মালয়েশিয়ায় যে আন্তরিক ও সম্মানজনক অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে তাকে শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের একজন সম্ভাবনাময় ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। জনশক্তির বাজারসহ কূটনৈতিক প্রাপ্তি যোগের অনেক কিছু রয়েছে সেখানেও।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

