সরকারি জায়গা দখল-বিদ্যুৎ ব্যবহার করেই চলে বিএনপি নেতার রাজনৈতিক কার্যকলাপ 

  • দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জায়গায় চলছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের; গণপূর্ত বলছে, সত্যতা মিললে ব্যবস্থা
  • গণপূর্তের দাবি, সরকারি আবাসিক এলাকায় রাজনৈতিক ক্লাবের সুযোগ নেই
  • আবাসিক এলাকায় বহিরাগতদের আনাগোনায় নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ
আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ১৬:৩০

রাজধানীর আজিমপুর সরকারি আবাসন এলাকার ২৭ নম্বর সরকারি কলোনিতে সরকারি জায়গা দখল করে রাজনৈতিক ক্লাব পরিচালনা এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ উঠেছে নবগঠিত লালবাগ থানা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক বদিউর আলম সুইটের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি জায়গায় স্থায়ীভাবে প্যান্ডেল টানিয়ে একটি রাজনৈতিক ক্লাব স্থাপন করায় দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় আবাসিক পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি আবাসন এলাকার অভ্যন্তরে একটি স্থানে প্যান্ডেল টানিয়ে ক্লাবসদৃশ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই স্থান থেকেই নিয়মিত রাজনৈতিক বৈঠক, দলীয় আলোচনা এবং বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালিত হয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিপুলসংখ্যক লোকজনের সমাগম হওয়ায় কলোনির অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।

কলোনিবাসীদের অভিযোগ, সরকারি আবাসিক এলাকা মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের নিরাপদ বসবাসের জন্য সংরক্ষিত। কিন্তু রাজনৈতিক ক্লাব স্থাপনের কারণে বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত বেড়ে গেছে। এতে নারী, শিশু ও প্রবীণ বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের মুখোমুখি হচ্ছেন।

স্থানীয়রা আরও বলেন, সরকারি জায়গা ব্যক্তিগত বা দলীয় প্রয়োজনে ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। অথচ দীর্ঘদিন ধরে একটি পক্ষ জায়গাটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজিমপুর গভর্নমেন্ট (দক্ষিণ) কল্যাণ সমিতির সাবেক এক আহ্বায়ক বলেন, "কলোনির ভেতরে রাজনৈতিক ক্লাব হওয়ার কারণে প্রতিদিনই বহিরাগতদের আনাগোনা থাকে। কোনো কর্মসূচি বা বৈঠক থাকলে রাস্তা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। বিশেষ করে নারী ও উঠতি বয়সী মেয়েদের চলাফেরায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।"

তিনি আরও অভিযোগ করেন, "ক্লাবের আড়ালে অনেক সময় অসামাজিক কর্মকাণ্ডও ঘটে। ক্লাবের পেছনের অংশে নিয়মিত মাদকসেবনের ঘটনা ঘটে বলে আমরা জানতে পারি। ফলে সন্ধ্যার পর পরিবার নিয়ে কলোনির মাঠে হাঁটাচলা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এটি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পান না।"

একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ক্লাবটিতে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে সরাসরি অবৈধ সংযোগ নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলোনির আরেক বাসিন্দা বলেন, "এই কলোনিতে প্রায় ৪১৮টি পরিবার বসবাস করে। অধিকাংশ বাসিন্দাই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সরকারি চাকরির সুবাদে এখানে থাকেন। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি যখন সরকারি জায়গা দখল করে রাজনৈতিক ক্লাব পরিচালনা করেন, তখন সাধারণ বাসিন্দাদের পক্ষে প্রতিবাদ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমরা পরিবার নিয়ে থাকি, তাই ঝামেলায় জড়াতে চাই না। প্রতিবাদ করলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এই আশঙ্কায় কেউ মুখ খোলেন না।"

কলোনিতে বসবাসকারী এক শিক্ষার্থী বলেন, "বিগত বিভিন্ন সরকারের সময়ও এই সরকারি আবাসিক এলাকায় কোনো রাজনৈতিক ক্লাব দেখিনি। এবারই প্রথম সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের ভেতরে দলীয় ক্লাব স্থাপন হতে দেখলাম। এটি সরকারি আবাসনের পরিবেশ ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।"

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি জায়গা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তারা অবিলম্বে বিষয়টি তদন্ত করে সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করা, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের অভিযোগ যাচাই এবং আবাসিক এলাকার নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

আবাসিক স্থাপনা, কোয়ার্টার এলাকায় দলীয় ক্লাব তৈরির প্রসঙ্গে আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমকে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। 

সরকারি আবাসিক এলাকায় কোনো রাজনৈতিক ক্লাব বা দোকান স্থাপনা নির্মাণ প্রসঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেল (ঢাকা) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. উজির আলী বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকাতে কোনো রাজনৈতিক ক্লাব করার সুযোগই নেই। তবে আবাসিক এলাকার ভেতরে এলোটিদের রিফ্রেশমেন্টের জন্য ক্লাব হতে পারে। তবে, যদি কোন রাজনৈতিক ক্লাব হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে গণপূর্ত বিভাগ এর বিরুদ্ধে নেবে। 

অভিযোগের বিষয়ে লালবাগ থানা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক বদিউর আলম সুইট বলেন, তিনি ওই সরকারি কলোনির একজন এলোটি। ক্লাব পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের সময় ব্যানার টানানো হয়েছিল। তিনি ওই ক্লাবে বসেন না এবং রাজনৈতিক ক্লাব পরিচালনার অভিযোগ সঠিক নয়।

 
ইত্তেফাক/এমএএম