জাপানে ব্যবসা পরিচালনা ভিসার নতুন ও কঠোর নিয়মের কারণে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন প্রবাসী বিদেশি উদ্যোক্তারা। তাদের আশঙ্কা, নতুন এসব শর্ত সময়মতো পূরণ করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে হতে পারে তাদের।
বুধবার (১ জুলাই) ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
টোকিওর ওকুবো এলাকায় নেপালি খাবারের ছোট একটি রেস্তোরাঁ চালান ৩৮ বছর বয়সী নেপালি নাগরিক বুধাথোকি সামঝানা। নিজের কষ্টার্জিত পরিশ্রমে গড়ে তোলা এই ব্যবসা এখন হারানোর ভয়ে তিনি দুশ্চিন্তায়।
তিনি বলেন, আমি সবসময় জাপান ও নেপালের মধ্যে একটা সেতু হয়ে উঠতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমার সেই স্বপ্ন পুরোপুরি ভেঙে গেছে।
জাপানে জনসংখ্যা দ্রুত কমছে এবং বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের অভাব দেখা দিলেও, দেশটিতে অভিবাসনবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ২০২৫ সালের শেষের দিকে ব্যবসা পরিচালনা ভিসার নিয়ম আরও কঠোর করে।
নতুন নিয়মে ব্যবসা পরিচালনা ভিসা পাওয়ার জন্য ন্যূনতম মূলধনের পরিমাণ আগের ৫০ লাখ ইয়েন থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩ কোটি ইয়েন (প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার মার্কিন ডলার)।
বুধাথোকি বলেন, এত বিশাল অঙ্কের টাকা জোগাড় করা আমাদের মতো ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।
২০১৬ সালে শিক্ষার্থী ভিসায় জাপানে আসা এই নেপালি যুবক কয়েক বছর সঞ্চয় করে ২০২৩ সালে প্রথম রেস্তোরাঁ খোলেন। চলতি বছর জানুয়ারিতে তৃতীয় রেস্তোরাঁ চালু করার পর দীর্ঘ ১০ বছর পর নিজের ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে নেপাল থেকে জাপানে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন।
কিন্তু এখন তার সবচেয়ে বড় চিন্তা মেয়েকে নিয়ে। মেয়ে ইতোমধ্যে জাপানের স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ভিসা নবায়ন না হলে তার ভবিষ্যৎ কী হবে, এটাই এখন তার মাথায় ঘুরছে।
একই সমস্যায় পড়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী মনীশ কুমার। প্রায় ৩০ বছর জাপানে বসবাস করার পরও সম্প্রতি তাকে জানানো হয়েছে, তার ব্যবসা পরিচালনা ভিসা আর নবায়ন করা হবে না।
ভিসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ অনেক বেশি কঠোর হয়েছে। এখন কর পরিশোধের রসিদ, সামাজিক বীমার কাগজপত্রসহ নানা ধরনের অতিরিক্ত নথি জমা দিতে হচ্ছে।
ইতোমধ্যে নতুন নিয়ম বাতিলের দাবিতে একটি অনলাইন পিটিশনে ৬৭ হাজারেরও বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।
২০২৪ সালের মে মাসে জাপানের বিচার মন্ত্রণালয় অবৈধ বিদেশি শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর থেকেই বিদেশিদের ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি বেড়েছে। গত বছরের উচ্চকক্ষ নির্বাচনে জাপানি-ফার্স্ট নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া দলগুলোর উত্থানের পর সরকারের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞ কাজুকি ইউদা ও দাইসুকে কোমোরির মতে, ভিসার অপব্যবহার ঠেকানোর উদ্দেশ্যে এই নীতি নেওয়া হলেও, এর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে ছোট রেস্তোরাঁর মালিক, তরুণ উদ্যোক্তা এবং বৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া বিদেশিদের।
নতুন নিয়মে এখন ব্যবসা পরিচালনা ভিসাধারীদের একজন জাপানি নাগরিক কিংবা দীর্ঘমেয়াদি বাসিন্দাকে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে। শ্রমিক সংকটে ভোগা জাপানে এই শর্ত পূরণ করাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: এএফপি

