গণমাধ্যমের আয়না নিখুঁত না হলে রাষ্ট্র ও সমাজে ভুল প্রতিবিম্ব তৈরি হয়: তথ্যমন্ত্রী

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ২৩:১২

গণমাধ্যমকে রাষ্ট্র ও সমাজের আয়না হিসেবে উল্লেখ করে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, এই আয়না নিখুঁত না হলে সমাজে রাষ্ট্র সম্পর্কে ভুল প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। সংবাদমাধ্যম যত বেশি নিখুঁতভাবে দায়িত্ব পালন করবে, নাগরিকেরা রাষ্ট্র ও সমাজের চলমান প্রক্রিয়া সম্পর্কে তত স্বচ্ছ ধারণা পাবে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

শুক্রবার (৩ জুলাই) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে অনুষ্ঠিত ল রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ)-এর রজতজয়ন্তী উদযাপন ও বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, তা বোঝার একটি বড় মানদণ্ড নির্ভর করে ল রিপোর্টারদের পেশাগত দায়িত্বশীলতার ওপর। কোনো শক্তিশালী সরকারপ্রধানকেও যখন আদালতের সামনে হাজির হতে হয়, তখন সাংবাদিকদের দায়িত্ব হয়ে পড়ে সেই সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে বস্তুনিষ্ঠভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা।

এ সময় বর্তমান সময়ের ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জহির উদ্দিন বলেন, অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশের ফলে তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন বেড়েছে, তেমনি নতুন ধরনের জটিলতাও তৈরি হয়েছে।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতার আলোচনায়ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। এআই ব্যবহার করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যেকোনো দৃশ্য বিকৃত করা, কোনো ব্যক্তির চেহারা পরিবর্তন করা কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা এখন সম্ভব। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাংবাদিকদের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপনের বিষয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন। জবাবে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও শহীদদের হত্যাকারীদের পক্ষেও একধরনের সাংবাদিকতা ছিল। গণমাধ্যমকে কোন মত প্রচার করবে বা কোন চিন্তার পক্ষে বয়ান তৈরি করবে, সে বিষয়ে সবার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু বস্তুনিষ্ঠ তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং কোনো বিশেষ পক্ষের হয়ে বয়ান তৈরি করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আমরা গণমাধ্যমের সবকিছুই বস্তুনিষ্ঠতার মানদণ্ডে বিচার করব।’

জহির উদ্দিন আরও বলেন, ‘কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার পক্ষে যারা বয়ান তৈরি করেন, জনগণ সেটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা জনগণের বিষয়। কেউ আইন লঙ্ঘন করলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আমরা পুরো বিষয়টিকে আইনের মানদণ্ডে দেখার চেষ্টা করছি।’

অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বর্তমানে এআই ব্যবহার করে ছড়ানো ‘ফেক নিউজ’ মোকাবিলায় প্রচলিত আইনগুলো যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং ডিজিটাল এভিডেন্স বা ডিজিটাল সাক্ষ্যকে বিচারব্যবস্থায় বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ করার জন্য সর্বজনীন আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান।

এ সময় বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের আদালতে অবাধ প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘আদালতের লাইভ সম্প্রচার চললেও সাংবাদিকদের এজলাসে ঢুকতে না দেওয়াটা কোনোভাবেই সঠিক কাজ নয়। আমি বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল ও মাননীয় মন্ত্রীকে অনুরোধ করব, যাতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদলে আমাদের এখানেও “লাইভ ল” ব্যবস্থার অনুমোদন দেওয়া হয়।’

এলআরএফের সভাপতি হাসান জাবেদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মিশনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক বদরুদ্দোজা বাদল, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মোহাম্মদ আলী প্রমুখ।

ইত্তেফাক/এমএস