যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে গ্রামীণ ইয়েমেন ফাউন্ডেশন (জিওয়াইএফ)। ২০২০ সালে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ১২ হাজারের বেশি নারী উদ্যোক্তার ক্ষুদ্র উদ্যোগে ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে।
নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্ভাবিত মাইক্রোক্রেডিট ও সোশ্যাল বিজনেস ধারণার ভিত্তিতে ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ইয়েমেন ফাউন্ডেশন (জিওয়াইএফ) যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক সেবার পরিধি সম্প্রসারণে কাজ করে যাচ্ছে।
'সোশ্যাল বিজনেস ডে ২০২৬'-এর সাইডলাইনে গ্রামীণ ইয়েমেন ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
গ্রামীণ ট্রাস্টের কারিগরি সহায়তায় বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত গ্রামীণ মডেলকে ইয়েমেনের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হচ্ছে জিওয়াইএফ। ২০২০ সালের জুলাই থেকে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরুর পর প্রতিষ্ঠানটি ১২ হাজারের বেশি নারী উদ্যোক্তার জন্য ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি ক্ষুদ্রঋণ বিনিয়োগ করেছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও হাজারো নারী টেকসই জীবিকা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। একই সঙ্গে প্রায় ৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ব্যবসা কার্যক্রমও পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ পর্যন্ত ৭ হাজার ৫৮৮টি সৌরবিদ্যুৎ হোম সিস্টেম স্থাপন, ১ হাজার ৬৩টি ক্লেফট লিপ ও প্যালেট অস্ত্রোপচার, ৯ হাজার ১৬১টি ছানি অপারেশন, ৪ হাজার ৫৬২টি পারিবারিক পানির ট্যাংক, ৭২৫টি শৌচাগার নির্মাণ এবং ৫ হাজার বিছানাপত্র বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ৯ হাজার ২০০টি জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণেও সহায়তা করেছে জিওয়াইএফ।
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে আটটি কিডনি পরিচর্যা কেন্দ্র পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ৭৩ হাজার ৫০৪টি গবাদিপশুকে টিকা প্রদান এবং ১ হাজার ৩১টি পশু আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেছে। শিক্ষা খাতে ১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি বই বিতরণের পাশাপাশি প্রবীণদের জন্য ২০টিরও বেশি গণশিক্ষা কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করেছে।
গ্রামীণ মডেল বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য গ্রামীণ ট্রাস্ট ইয়েমেনে ছয়জন রিসোর্স পার্সন নিয়োগ দিয়েছে। বর্তমানে দুজন প্রকল্প পরিচালক ও শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী তিন মাসের মধ্যে আরও চারজন রিসোর্স পার্সন যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
গ্রামীণ ইয়েমেন ফাউন্ডেশন বর্তমানে ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আনুষ্ঠানিক মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক হিসেবে লাইসেন্স পাওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। লাইসেন্স পেলে এটিই হবে ইয়েমেনের প্রথম গ্রামীণ মডেলভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক এবং বাংলাদেশের বাইরে গ্রামীণ ট্রাস্টের আন্তর্জাতিক রিপ্লিকেশন কর্মসূচির আওতায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম গ্রামীণ মডেলভিত্তিক মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, ২০৫০ সালের মধ্যে ৩৫০টি শাখার মাধ্যমে ১০ লাখ ৬৩ হাজার ১১৬ জন নারী সদস্যের কাছে পৌঁছানো। এর মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ইয়েমেনের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করছে জিওয়াইএফ।
প্রফেসর ইউনূস গ্রামীণ ইয়েমেনের অগ্রগতি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, বিশ্বের অন্যতম নাজুক পরিবেশেও গ্রামীণ ইয়েমেন প্রমাণ করছে যে, সামাজিক উদ্ভাবন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সমন্বয় মানুষের জীবন বদলে দিতে এবং আরও সহনশীল ও টেকসই সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম।

