টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদের পানি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদের দুটি প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জের অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আকস্মিকভাবে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গবাদিপশু, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন দুর্গতরা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদের প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এর আগে দুপুরে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায় বাঁধ ভেঙে প্রবল স্রোতে পানি হাওরে ঢুকে পড়ে।
কালীগঞ্জের বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাঁও, নতুনবাজার, বালিহাটা, কালীগঞ্জ, যাদবপুর, বিষ্ণুরামপুর, দক্ষিণচর, রামনগর, ধোপাখাল ও বনদক্ষিণ এলাকার অংশসহ অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অনেক বাড়িঘরে কোমরসমান পানি উঠেছে। পানির তোড়ে তলিয়ে গেছে সড়ক ও ফসলি জমি।
হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ স্থানীয় বাসিন্দারা গবাদিপশু এবং প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, আবার কেউ আশ্রয়কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। হবিগঞ্জ শহরের কামড়াপুর ও দানিয়ালপুর এলাকার কয়েকটি স্থানেও পানি প্রবেশ করেছে।
এদিকে চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজারসংলগ্ন এলাকায় খোয়াই নদের ভাঙন আবারও তীব্র হয়েছে। এতে হরিজন সম্প্রদায়ের রবিদাসপাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবার ঝুঁকিতে পড়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনাও।
খোয়াই নদের মাছুলিয়া পয়েন্টের শহর রক্ষা বাঁধও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বাঁশসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভাঙনের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে রাতেই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল ইসলাম, হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আবু জাহেরসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে মাইকিং করে প্লাবিত এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আহ্বান জানানো হয়। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাত ১১টার দিকে পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। এতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পানি আরও বাড়লে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সঙ্গে মিরপুর ও আশপাশের এলাকার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে দ্রুত বাঁধ মেরামত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণসহায়তা এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগ বাড়ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, খোয়াই নদের চুনারুঘাটের বাল্লা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৯২ সেন্টিমিটার, শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্টে ১১৩ সেন্টিমিটার এবং মাছুলিয়া পয়েন্টে ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
পাউবোর কর্মকর্তারা জানান, সন্ধ্যার পর নদ-নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও বাঁধ ভেঙে কয়েকটি এলাকা ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহের গণমাধ্যমকে, বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। দুর্গতদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। জরুরি সহায়তার জন্য ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল এবং ১ হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনা খাবার মজুত রাখা হয়েছে।

