গণহত্যা থেকে বাঁচতে গেছেন ব্রাজিলে, গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক জয় গাজার কিশোরীর

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ১৪:১৪

ইসরায়েলি হামলা, বাস্তুচ্যুতি ও পুনর্বাসনের কঠিন অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ব্রাজিলে নতুন জীবন শুরু করা ১৫ বছরের ফিলিস্তিনি কিশোরী তালা মোহাম্মদ আওয়াদ সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যের সরকারি স্কুলভিত্তিক গণিত প্রতিযোগিতা ওএমএএসপি-২০২৫-এর দ্বিতীয় ধাপে স্বর্ণপদক জিতেছে। এই সাফল্যের ফলে সে এখন প্রতিযোগিতার পরবর্তী রাজ্য-পর্যায়ের ধাপে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে।

পর্তুগিজ ভাষায় প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, তালা ‘অলিম্পিয়া দে ম্যাতেমেটিকা দাস এস্কুলাস এস্তাদুয়াইস দে সাও পাওলো’ বা ওএমএএসপি-২০২৫-এর দ্বিতীয় ধাপে স্বর্ণপদক পেয়েছে। প্রতিযোগিতার এই ধাপটি পৌরসভাভিত্তিক বাছাইপর্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ফলের মধ্য দিয়ে সে এখন রাজ্য-পর্যায়ের পরবর্তী ধাপে জায়গা করে নিয়েছে।

সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যের সরকারি স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত এই প্রতিযোগিতাকে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক আয়োজনগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়। এর লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের গণিত দক্ষতা বাড়ানো এবং সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় একাডেমিক উৎকর্ষ উৎসাহিত করা।

গাজায় যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ ও বাস্তুচ্যুতির অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ব্রাজিলে পুনর্বাসিত হওয়ার পর তালার এই সাফল্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। নতুন দেশ, নতুন ভাষা এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে অল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে সে প্রতিযোগিতার সেরা শিক্ষার্থীদের একজন হিসেবে উঠে এসেছে।

এক সাক্ষাৎকারে তালা জানায়, ফল প্রকাশের পর প্রথমে সে স্বর্ণপদক পাওয়ার বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারেনি। তার ভাষায়, দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম ও পরিবারের সমর্থনের ফলেই এই সাফল্য এসেছে। সে প্রথমেই বাবা-মাকে খবরটি দিতে চেয়েছিল, কারণ তারা সব সময় তাকে সাহস যুগিয়েছেন এবং যেকোনো পরিস্থিতিতেই সফল হতে পারবে বলে ভরসা দিয়েছেন।

তালা আরও জানায়, ভালো ফলের আশা তার ছিল, তবে স্বর্ণপদক পাওয়া ছিল তার জন্য আনন্দঘন বিস্ময়। তার কাছে এই পদক শুধু একটি একাডেমিক অর্জন নয়; বরং একজন ফিলিস্তিনি হিসেবে নিজের পরিচয়, দৃঢ়তা এবং আশার প্রতীক। তার মতে, এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে সে শুধু নিজের নয়, ফিলিস্তিন এবং প্রতিটি ফিলিস্তিনি শিশুর প্রতিনিধিত্ব করছে, যারা সব প্রতিকূলতার মধ্যেও সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখে।

ব্রাজিলে এসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পর্তুগিজ ভাষা শেখা এবং নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। তালা জানায়, শুরুতে ভাষাটি তার কাছে কঠিন মনে হয়েছে, অনেক সময় ভয়ও লাগত, কারণ সবকিছু বুঝতে পারত না। তবে শিক্ষক ও সহপাঠীরা তাকে ধৈর্য ধরে সহযোগিতা করেছেন। বাড়িতে বাবা-মাও প্রতিদিন তাকে পড়াশোনায় সাহায্য করেছেন এবং কখনো আশা না হারাতে উৎসাহ দিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু সহজ হয়ে আসে বলে জানায় সে।

গাজার শিশুদের উদ্দেশে তালার বার্তা, যুদ্ধ যত ভয়াবহই হোক, আশা হারানো যাবে না। পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রেখে স্বপ্ন আঁকড়ে থাকলে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির পরও সফল হওয়া সম্ভব বলেই তার বিশ্বাস।

মেয়ের এই সাফল্যে পরিবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন তালার বাবা মোহাম্মদ আওয়াদ। তার ভাষ্য, খবরটি শোনার পর পরিবারের সবাই আনন্দের কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার মতে, তালা শুধু একটি পদক জেতেনি; যুদ্ধ তাদের কাছ থেকে যে আনন্দ কেড়ে নিয়েছিল, তার একটি অংশ যেন ফিরিয়ে এনেছে।

গাজার দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, মেয়ের এই সাফল্য তাকে বোমা বিস্ফোরণের শব্দ, ভয় এবং অনিশ্চয়তার রাতগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে উঠে এসে তালা আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে—এটিকে তিনি সাধারণ জয় নয়, বরং যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি শিশুর বিজয় হিসেবে দেখছেন।

মোহাম্মদ আওয়াদের মতে, ব্রাজিলে এসে তালা ধীরে ধীরে যুদ্ধের মানসিক ক্ষত কাটিয়ে উঠছে। গাজায় যুদ্ধ শিশুদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছিল, কিন্তু ব্রাজিলে সে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ পেয়েছে, যেখানে শিখতে, স্বপ্ন দেখতে এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারছে। তার পর্যবেক্ষণ, ধাপে ধাপে তালা যেন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছে।

গাজা থেকে ব্রাজিলে আসার পথটি ভয়, বেদনা ও ভারী স্মৃতিতে ভরা ছিল বলেও জানান তিনি। পরিবারটিকে বাড়ি, আত্মীয়স্বজন এবং পুরো একটি জীবন পেছনে ফেলে আসতে হয়েছে। তবে সন্তানদের মৃত্যু ও আতঙ্ক থেকে দূরে রাখতে নতুন করে শুরু করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ ছিল না।

নতুন দেশে বসবাস করলেও পরিবারের পরিচয়ের কেন্দ্রে ফিলিস্তিনই রয়েছে বলে জানিয়েছেন তালার বাবা। তিনি বলেন, তাদের কাছে ফিলিস্তিন শুধু একটি ভূখণ্ড নয়; এটি স্মৃতি, রক্ত ও পরিচয়ের অংশ। সেই কারণেই তালাকে এমনভাবে বড় করা হচ্ছে, যাতে সে বুঝতে পারে ব্রাজিলে তার এই সাফল্য একই সঙ্গে ফিলিস্তিনেরও সাফল্য। পরিবারটি নিজেদের ভাষা, ইতিহাস ও শিকড় ধরে রাখার চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে।

তিনি আরও বলেন, ব্রাজিলে সন্তানদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চান তারা, তবে নিজেদের উৎস ভুলে নয়। তাদের প্রত্যাশা, সন্তানরা একদিকে ব্রাজিলীয় সমাজে সম্মানিত সদস্য হয়ে উঠবে, অন্যদিকে নিজেদের শিকড় ও ন্যায্য সংগ্রামের প্রতিও বিশ্বস্ত থাকবে।

গাজার মানুষের উদ্দেশে মোহাম্মদ আওয়াদ বলেন, যুদ্ধ অনেক কিছু কেড়ে নিলেও মানুষের মর্যাদা বা বেঁচে থাকার শক্তি কেড়ে নিতে পারেনি। তার মতে, তালার অর্জন দেখিয়েছে—গাজার একটি শিশুও ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উঠে এসে ভয়কে সাফল্যে রূপ দিতে পারে।

ওএমএএসপি বা ‘অলিম্পিয়া দে ম্যাতেমেটিকা দাস এস্কুলাস এস্তাদুয়াইস দে সাও পাওলো’ সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যের সরকারি স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গণিত প্রতিযোগিতা। এর বিভিন্ন ধাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গণিত দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয় এবং পরবর্তী ধাপের জন্য বাছাই করা হয়। তালার স্বর্ণপদক অর্জন তাকে এই প্রতিযোগিতার রাজ্য-পর্যায়ের পরবর্তী ধাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

ইত্তেফাক/এনএন